কলকাতা: একটা সময় ভারতীয় ফুটবলে গোলপোস্ট মানেই ভরসা ছিল বাঙালির (Bengal Football) হাতে। সুব্রত পালের দুঃসাহসিক সেভ কিংবা তার আগের প্রজন্মে বাইচুং ভুটিয়ার নেতৃত্বে তৈরি হওয়া আত্মবিশ্বাস! সব মিলিয়ে বাংলা ছিল ভারতীয় ফুটবলের এক শক্ত ভিত। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই ধারাবাহিকতা কোথায় হারাল? নতুন কোনও ভাস্কর গাঙ্গুলী বা সুব্রত পাল কেন উঠে আসছে না? কলকাতার ময়দানে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন করলে অনেক কোচই একই উত্তর দেন, সমস্যা শুরু হচ্ছে একেবারে গোড়া থেকে। ময়দানের স্থানীয় কোচ শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, “আগে পাড়ার মাঠেই গোলকিপার তৈরি হত। এখন বাচ্চারা সবাই ফরোয়ার্ড হতে চায়। গোলকিপার হওয়ার আগ্রহই কমে গেছে।” তাঁর কথায়, “গোলকিপিং মানে কষ্ট, ঝুঁকি আর পরিশ্রম, যেটা এখনকার প্রজন্ম এড়িয়ে যেতে চায়।”
আরও বড় সমস্যা প্রশিক্ষণের অভাব। আগে বড় ক্লাবগুলিতে আলাদা গোলকিপিং কোচ থাকলেও এখন সেই ধারাবাহিকতা নেই বললেই চলে। মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট (Mohun Bagan Super Giant) বা ইস্টবেঙ্গলের (East Bengal FC) মতো ক্লাবেও অনেক সময় বিদেশি কোচের ওপর নির্ভরতা বেশি, ফলে স্থানীয় গোলকিপারদের উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাক্তন গোলকিপার কোচ অরিন্দম দে বলেন, “বিদেশি গোলকিপার খেললে ক্লাব তাৎক্ষণিক সাফল্য পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাংলার ক্ষতি হচ্ছে।” এই প্রসঙ্গে উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, মানসিক দৃঢ়তা। গোলকিপারের ভুল মানেই গোল, আর সেই চাপ সামলানো সহজ নয়। সাবেক ফুটবলার দেবাশিস মুখার্জি বলেন, “আমাদের সময় কোচরা মানসিকভাবে শক্ত করে তুলতেন। এখন সেই ধৈর্য বা সময় কেউ দিতে চায় না।” তাঁর মতে, “একটা ম্যাচে ভুল করলেই ছেলেটাকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়।”
পরিসংখ্যানও বলছে একই কথা। গত কয়েক বছরে আইএসএল বা আই-লিগে নিয়মিত প্রথম একাদশে বাঙালি গোলকিপারের সংখ্যা কমেছে। সুযোগ পাচ্ছে কম, ফলে অভিজ্ঞতাও বাড়ছে না। আইএসএল এর মঞ্চে যেখানে প্রতিটি ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ক্লাবগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তবে সবটা যে অন্ধকার, তা নয়। এখনও কিছু অ্যাকাডেমিতে কাজ চলছে। কোচ সৌগত বসু জানান, “আমরা চেষ্টা করছি ছোটবেলা থেকেই গোলকিপিংকে আলাদা গুরুত্ব দিতে। কিন্তু এই পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে।” তাঁর বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা আর সুযোগ পেলে বাংলা আবারও ভালো গোলকিপার উপহার দিতে পারবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু ফুটবলের নয়, একটা সংস্কৃতির। যেখানে একসময় গোলপোস্ট মানেই ছিল সাহস, আত্মত্যাগ আর গর্ব, সেই জায়গাটাই আজ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। নতুন কোনও সুব্রত পাল উঠে আসার জন্য দরকার সময়, বিশ্বাস আর সঠিক দিশা। নইলে বাংলার গোলপোস্টে শূন্যতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।




















