কলকাতা: ময়দানের আকাশে আচমকা নামা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই জন্ম নিল এক অনন্য গল্প সংগ্রাম, শোক আর অদম্য মানসিক শক্তির গল্প। সল্টলেকের জিডি গ্রাউন্ডে সেই দিন যেন প্রকৃতির ঝড়কে টেক্কা দিলেন অরুণাচল প্রদেশের তরুণী ফুটবলার অ্যানি তায়াং (Annie Tayang)। একাই সাতটি গোল করে তিনি শুধু ম্যাচ জেতাননি, নিজের জীবনের কঠিন অধ্যায়কেও জয় করার ইঙ্গিত দিলেন। মহিলা ফুটবলে বেশি গোলের নজির থাকলেও, একাই সাতবার জাল কাঁপানো নিঃসন্দেহে বিরল কৃতিত্ব। তবে এই সাফল্যের মূল্য যে কতটা, তা বোঝা যায় অ্যানির সাম্প্রতিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহে। মাত্র কয়েকদিন আগেই মাকে হারিয়েছেন ২৩ বছরের এই ফুটবলার। হঠাৎ সেই শোকের ধাক্কা সামলে আবার মাঠে ফেরা—এ এক অসাধারণ মানসিক লড়াই।
মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন অ্যানি। পরিবারের পাশে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার ফিরে আসেন কলকাতায়। শোকের ভার বুকে নিয়েই খুব অল্প সময়ের মধ্যে কন্যাশ্রী কাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রথম ম্যাচে গোল না পেলেও নিজের ছন্দের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর পরের ম্যাচেই বিস্ফোরণ। লাজুক স্বভাবের অ্যানি সাধারণত প্রচারের আলো এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সাত গোলের পর আর তা সম্ভব হয়নি। ম্যাচ শেষে যখন তাঁর হাতে ওঠে সেরার পুরস্কার, তখন কথার চেয়ে বেশি কথা বলছিল তাঁর চোখের জল। মাকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিল তাঁর গলা। অ্যানি জানালেন, এই সাফল্য তাঁর একার নয়—দলের সতীর্থ, কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফদের অবদানও রয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে এই দিনটি তিনি উৎসর্গ করতে চান তাঁর মাকেই। কারণ ছোটবেলা থেকে ফুটবলে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা তিনিই দিয়েছিলেন। শেষবার কথা বলার সময়ও মা তাঁকে বলেছিলেন খেলায় মন দিতে, বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে।
অরুণাচলের লোহিত জেলার তেজুর বাসিন্দা অ্যানি একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। বাবা পেশায় একজন পিয়ন, সংসারে রয়েছেন তিন বোন ও এক ভাই। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছেন তিনি। অ্যানির এই পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বসিত তাঁর কোচ প্রশান্ত ভট্টাচার্য। তিনি জানান, অ্যানির দক্ষতা সম্পর্কে তাঁর আগে থেকেই ধারণা ছিল। ম্যাচের আগে হ্যাটট্রিকের কথাও বলেছিলেন মজার ছলে। কিন্তু ছাত্রী যে সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যাবে, তা হয়তো তিনিও ভাবেননি। দিনের শেষে বৃষ্টি থেমেছে, মাঠ ফাঁকা হয়েছে, উল্লাসও স্তিমিত। কিন্তু ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যানির চোখে যেন অন্য এক শূন্যতার ছাপ। সাফল্যের উজ্জ্বল আলোয়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক গভীর অভাব—যে মানুষটির জন্য এই লড়াই, তিনি আজ আর পাশে নেই।




















