রানাদাস: গত কয়েক বছরে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) একাধিক রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বেশকিছু মামলায় দ্রুত শুনানি এবং তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ ঘিরে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যখন সেই মামলাগুলিতে উপস্থিত ছিলেন দেশের দুই পরিচিত সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বাল এবং অভিষেক মনু সিংভি৷ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন, কেন এই ধরনের মামলাগুলিতে দ্রুত ‘ওরাল মেনশনিং’য়ের মাধ্যমে শুনানি হয়? এটি কি নিছকই মামলার গুরুত্ব, না কি আইনজীবীর উপস্থিতিরও প্রভাব থাকে?
যেসব মামলাকে ঘিরে বিতর্ক
অতীতের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মামলা
১. পবন খেড়া মামলা
কংগ্রেস নেতা পবন খেড়ার গ্রেফতারির পর সুপ্রিম কোর্টে দ্রুত শুনানির আবেদন করা হয়। আদালত তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করে গ্রেফতারিতে স্থগিতাদেশ দেয়। ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
২. তিস্তা সীতলওয়াদের মামলা
মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সীতলওয়াদের গ্রেফতারির পর ছুটির দিনে, রাতের সময় জরুরি শুনানি হয়। আদালতের দ্রুত পদক্ষেপ নজর কেড়েছিল।
৩. অরবিন্দ কেজরিওয়াল সংক্রান্ত শুনানি
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর মামলায়ও দ্রুত শুনানি হয়েছিল, যাকে অনেকেই ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অভূতপূর্ব’ বলে আখ্যা দেন।
৪. মহারাষ্ট্র রাজনৈতিক সংকট
মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একাধিক সাংবিধানিক প্রশ্নে দ্রুত শুনানি হয়। এই মামলাগুলিও ওরাল মেনশনিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়েছিল।
এই মামলাগুলির একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়৷ তা হল ওরাল মেনশনিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত শুনানি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সিব্বল বা সিংভির উপস্থিতি।
পরে আরও কয়েকটি মামলার প্রসঙ্গ উঠে আসে৷ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, তামিলনাড়ুর সাংবিধানিক প্রশ্ন, তেলেঙ্গানা ফোন ট্যাপিং বিতর্ক, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা, শিবসেনা-উদ্ধব গোষ্ঠী সংক্রান্ত মামলা কিংবা দিল্লি সরকার বনাম উপ-রাজ্যপাল বিতর্ক। এখানেও একই ধরনের আইনজীবীদের দেখা গিয়েছে।
প্রশ্নটা আসলে কোথায়?
সমালোচকদের যুক্তি সরল! যখনই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলা, এবং সেই মামলায় এই দুই আইনজীবীর উপস্থিতি থাকে, তখন দ্রুত শুনানি হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, প্রভাবশালী আইনজীবী থাকলে আদালতের দরজা দ্রুত খোলে।
কিন্তু আইন মহলের একাংশ ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁদের মতে, এই ধরনের মামলাগুলো নিজেই সাংবিধানিক গুরুত্বসম্পন্ন। গ্রেফতারি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নির্বাচিত সরকারের স্থায়িত্ব বা সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন জড়িত থাকলে আদালত দ্রুত হস্তক্ষেপ করতেই পারে।
‘ওরাল মেনশনিং’ কতটা অস্বাভাবিক?
সুপ্রিম কোর্টে ওরাল মেনশনিং বহুদিনের প্রথা। জরুরি পরিস্থিতিতে আইনজীবী বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, মামলাটি অবিলম্বে শোনা প্রয়োজন। বিচারপতিরা পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের। আইনজীবী শুধু আবেদন করতে পারেন। গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা বেঞ্চের।
তবে বাস্তবতা হল, দেশের এই অভিজ্ঞ আইনজীবীরা আদালতের প্রক্রিয়া ভালো বোঝেন। কোন যুক্তি কীভাবে তুলে ধরলে জরুরি শুনানির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হবে, সেটি তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারেন। ফলে তাঁদের আবেদন তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
জনমত বনাম বিচারব্যবস্থা
এই বিতর্কে দুটো স্তর রয়েছে।
- একদিকে বলা হচ্ছে, বিচারব্যবস্থায় সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত। যদি একজন সাধারণ নাগরিক একই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত শুনানি না পান, অথচ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পান, তাহলে প্রশ্ন উঠবে।
- অন্যদিকে আদালতের সমর্থকদের বক্তব্য, বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় হলে আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের সুরক্ষাই নিশ্চিত করে।
তাহলে কি নিয়ম বদলাবে?
আইনজীবী মহলে গুঞ্জন রয়েছে, ওরাল মেনশনিং প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে আরও কঠোর নির্দেশিকা আসতে পারে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র মৌখিক আবেদন নয়, লিখিত যুক্তি ও স্পষ্ট জরুরি কারণ দেখাতে হতে পারে। যদি এমন পরিবর্তন হয়, তাহলে রাজনৈতিক মামলায় তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে।
কাপিল সিব্বল বা অভিষেক মনু সিংভির উপস্থিতি কোনও মামলার ফল নির্ধারণ করে, এমন দাবি সরাসরি প্রমাণ করা কঠিন। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না, তাঁরা সাধারণত বড় ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলাতেই থাকেন। ফলে দ্রুত শুনানি হলে সেটি বেশি নজরে আসে।
প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রক্রিয়ানির্ভর। সুপ্রিম কোর্ট যদি ভবিষ্যতে ওরাল মেনশনিং নিয়ে স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে, তাহলে এই বিতর্ক অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে। গণতন্ত্রে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা অটুট রাখতে স্বচ্ছতা ও সমতা—এই দুটোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার, সর্বোচ্চ আদালত এই আলোচনার প্রেক্ষিতে কী পথ বেছে নেয়।




















