বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদের তালিকায় বাঙালির প্রিয় গঙ্গাপাড়ের শহর!

বারানসী: বিশ্বের প্রাচীনতম বসতিপূর্ণ শহরগুলির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বাঙালির প্রিয় শহর। যার নাম একসময় বাঙালির মুখে মুখে ঘুরত। যুগ যুগ ধরে বাঙালির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ভারতের গঙ্গাপাড়ের ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
varanasi ganga aarti

বারানসী: বিশ্বের প্রাচীনতম বসতিপূর্ণ শহরগুলির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বাঙালির প্রিয় শহর। যার নাম একসময় বাঙালির মুখে মুখে ঘুরত। যুগ যুগ ধরে বাঙালির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ভারতের গঙ্গাপাড়ের ঐতিহাসিক শহর। প্রায় ৩,০০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই শহর কেবল ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও অনন্য। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঐতিহাসিক সমীক্ষায় বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদের তালিকায় ২১ নম্বরে রয়েছে বারাণসীর (Varanasi) নাম। আর এই শহরের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক বহু শতাব্দী পুরনো ধর্ম, সাহিত্য, সিনেমা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সেই যোগ আজও অটুট।

বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে জেরিকো (ইসরায়েল) প্রায় ১১,০০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে। তার পরেই বিব্লোস (লেবানন) ও আরগস (গ্রিস) প্রায় ৭,০০০ বছর, দামাস্কাস ও আলেপ্পো (সিরিয়া) ৬,৩০০ বছর, সুসা (ইরান) ৬,২০০ বছর, প্লভদিভ (বুলগেরিয়া), সিডন (লেবানন) ও ফাইয়ুম (মিশর) প্রায় ৬,০০০ বছরের প্রাচীন। এই দীর্ঘ তালিকায় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে একমাত্র বারাণসী—যার প্রাচীনত্ব প্রায় তিন সহস্রাব্দ।

   

হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বারাণসীর পরিচিতি সুপ্রাচীন। পুরাণ মতে, স্বয়ং মহাদেবের বাসস্থান এই কাশী। গঙ্গার তীরে অবস্থিত অসংখ্য ঘাট-দশাশ্বমেধ, মণিকর্ণিকা, পঞ্চগঙ্গা, আজও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখর। তবে ধর্মীয় গুরুত্বের বাইরেও বারাণসী ভারতীয় সভ্যতার ধারক ও বাহক।

বাঙালির সঙ্গে বারাণসীর ঐতিহাসিক যোগ

বারাণসীর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক বহু প্রাচীন। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে অসংখ্য বাঙালি পণ্ডিত, সাধক ও শিক্ষার্থী কাশীতে বসবাস করেছেন। সংস্কৃত শিক্ষা ও দর্শনচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাশী ছিল বাঙালি বিদ্বজ্জনের অন্যতম আকর্ষণ। এমনকি আজও বারাণসীর কিছু পাড়া ‘বাঙালিটোলা’ নামে পরিচিত, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি পরিবার বসবাস করে আসছে।

অনেক বাঙালি পরিবারে এখনো “কাশীবাস” একটি আবেগের বিষয়। পিতৃপুরুষদের অস্থি-বিসর্জন, পিণ্ডদান কিংবা জীবনের শেষ পর্বে কাশীতে থাকার আকাঙ্ক্ষা—এই সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক অনুভব।

সিনেমায় কাশী: সত্যজিৎ থেকে আধুনিক পরিচালক

বারাণসীর গলি, ঘাট ও রহস্যময় আবহ বাঙালি সিনেমাতেও বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এর পটভূমি ছিল বারাণসী। ছবির বহু দৃশ্য দশাশ্বমেধ ঘাট ও কাশীর অলিগলিতে চিত্রায়িত হয়েছে। ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ুর সেই কাশী অভিযান আজও দর্শকের মনে তাজা।

শুধু সত্যজিৎ নন, ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে শুরু করে একাধিক বাংলা ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রে কাশীর চিত্র উঠে এসেছে। কাশীর ভোরের গঙ্গা আরতির দৃশ্য, সরু গলি, প্রাচীন মন্দির—সব মিলিয়ে এক রহস্যময় ও নস্টালজিক আবহ তৈরি করে, যা বাঙালি দর্শকের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

সাহিত্য ও সঙ্গীতে কাশীর প্রভাব

বাংলা সাহিত্যে কাশীর উল্লেখ বহুবার এসেছে। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শরৎচন্দ্র—অনেক লেখকের রচনায় কাশীর ছোঁয়া রয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কাশী সফর করেছিলেন এবং তাঁর ভ্রমণকথায় শহরের উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কাশীর ধ্রুপদী সঙ্গীত ও বেনারসি ঘরানা বাঙালি সংগীতপ্রেমীদের কাছেও সমাদৃত।

সংস্কৃতির সেতুবন্ধন

বারাণসী কেবল একটি প্রাচীন শহর নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার প্রতীক। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্যের মিলন ঘটেছে। সারনাথের ধ্বংসাবশেষ থেকে শুরু করে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির, সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক ইতিহাস বহন করছে এই জনপদ।

বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলির তালিকায় নাম থাকা মানে কেবল পুরনো ইট-পাথরের ইতিহাস নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন মানব বসতির সাক্ষ্য। সেই দিক থেকে বারাণসী আজও জীবন্ত—ভোরের সূর্যোদয়ে গঙ্গাস্নান, সন্ধ্যার আরতি, সঙ্গীত, শিক্ষা ও আচার-অনুষ্ঠানে প্রতিদিন নবীন হয়ে উঠছে এই প্রাচীন শহর।

বিশ্বের প্রাচীনতম ২১টি জনপদের তালিকায় ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বারাণসীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গর্বের। আর বাঙালির কাছে কাশী শুধু তীর্থ নয়—এ এক চিরচেনা, চিরআপন সাংস্কৃতিক ঠিকানা। ইতিহাস, ধর্ম, সিনেমা ও সাহিত্যের সেতুবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শহর তাই বাঙালির হৃদয়ে আজও বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google