ওয়াশিংটন: বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ আমেরিকায় ধর্মীয় জনসংখ্যার মানচিত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন ধরা পড়ছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে উঠে এসেছে ইসলাম (Islam Growth in USA)। ‘জিওম্যাপড’ নামের একটি সংস্থার প্রকাশিত মানচিত্রে দেখা গিয়েছে, দেশের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি রাজ্যে ইসলাম বর্তমানে দ্রুততম হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবণতা ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলাবামা, আরকানসাস, কলোরাডো, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আইডাহো, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, কানসাস, কেন্টাকি, লুইজিয়ানা, মিশিগান, মিসিসিপি, মিসৌরি, নেব্রাস্কা, নর্থ ক্যারোলাইনা, নর্থ ডাকোটা, ওহাইও, ওকলাহোমা, সাউথ ডাকোটা, টেক্সাস, ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, উইসকনসিন এবং ওয়াইয়োমিংসহ বহু রাজ্যে ইসলামই সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা ধর্ম। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন, জন্মহার এবং ধর্মান্তর, এই তিনটি বড় কারণ ইসলামি জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে মিশিগান ও টেক্সাসের মতো রাজ্যে বহুদিন ধরেই উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে। ডিয়ারবর্ন (মিশিগান) শহরকে প্রায়ই আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও ফ্লোরিডা ও জর্জিয়ার মতো দক্ষিণী রাজ্যেও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের একটি বড় অংশ মুসলিম হওয়ায় এই বৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করছেন জনসংখ্যাতত্ত্ববিদরা।
অন্যদিকে, সব রাজ্যে কিন্তু ইসলাম শীর্ষে নেই। আলাস্কা, ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই, মন্টানা, ওরেগন এবং ওয়াশিংটনে দ্রুততম বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে উঠে এসেছে বৌদ্ধধর্ম। এই রাজ্যগুলিতে এশীয় অভিবাসীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার স্বাভাবিক বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। আবার অ্যারিজোনা, নেভাডা ও উটাহ-তে হিন্দুধর্ম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তি ও চিকিৎসাক্ষেত্রে কর্মরত ভারতীয় ও নেপালি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তথ্য বলছে, কানেকটিকাট, ডেলাওয়্যার, মেইন, মেরিল্যান্ড, ম্যাসাচুসেটস, মিনেসোটা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ জার্সি, নিউ মেক্সিকো, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া, রোড আইল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলাইনা, টেনেসি এবং ভারমন্টে দ্রুততম বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে ইহুদিধর্ম (জুডাইসম) উঠে এসেছে। নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো রাজ্যে ঐতিহাসিকভাবেই বড় ইহুদি সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
ধর্মীয় জনসংখ্যার এই পরিবর্তন আমেরিকার বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। ফলে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ সেখানে বসবাস ও ধর্মচর্চার সুযোগ পান। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, “দ্রুততম বর্ধনশীল” শব্দবন্ধটি মোট সংখ্যার নিরিখে নয়, বরং বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে নির্ধারিত। অর্থাৎ, কোনও রাজ্যে একটি ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও যদি বৃদ্ধি হার বেশি হয়, তবে সেটিকেই দ্রুততম বর্ধনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বিশ্বায়নের প্রভাবও ধর্মীয় মানচিত্রে পরিবর্তন আনছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই ধরনের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে উৎস ও পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
সব মিলিয়ে, আমেরিকার ধর্মীয় চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। ইসলাম একাধিক রাজ্যে দ্রুততম হারে বিস্তার লাভ করলেও বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম এবং ইহুদিধর্মও বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখাচ্ছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আপাতত একথা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের বহুধর্মী সমাজে পরিবর্তনের হাওয়া জোরদার হচ্ছে।



















