
কলকাতা: বাংলার SIR প্রক্রিয়া ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে নতুন মোড় নিল ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক (SIR voter roll)। সোমবার শীর্ষ আদালত ভোটার তালিকার দাবি ও আপত্তি খতিয়ে দেখার সময়সীমা আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কর্মীদের ওপর হুমকি, হামলা ও বাধা দেওয়ার অভিযোগে রাজ্যের ডিজিপিকে ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিলের নির্দেশও দিয়েছে আদালত। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে এই বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে তৎকালীন ডিজিপি রাজীব কুমারের আমলে। তিনি সদ্য অবসর নিলে ডিজিপির পদে আসেন পীযুষ পাণ্ডে। তাই রাজীবের কৃতকর্মের ফল এখন পীযুষকে ভুগতে হচ্ছে বলে মত তাদের।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি এন. ভি. আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত সময়ের পরে অন্তত এক সপ্তাহ সময় বাড়াতে হবে, যাতে দাবি ও আপত্তিগুলি সঠিকভাবে পরীক্ষা করা যায়। শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, SIR প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বাধা বা বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না। তাঁর মন্তব্য, “এই প্রক্রিয়ায় কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। সব রাজ্যের কাছেই এই বার্তা পরিষ্কার হওয়া উচিত।”
আরও দেখুন: সাভারকার ভারত রত্ন পেলে গডসে কেন নয়? প্রশ্ন ওআইসির
আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। বেঞ্চ জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা অন্তর্ভুক্ত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ERO) হাতেই থাকবে। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ করা মাইক্রো-অবজারভারদের ভূমিকা শুধুমাত্র সহায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, মাইক্রো-অবজারভাররা কেবল জেলা নির্বাচন আধিকারিক বা ERO-দের কাজে সহায়তা করবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ERO-রাই। পাশাপাশি, আপত্তিকারী ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত না হলেও, আইন অনুযায়ী আপত্তিগুলি বিবেচনা করতে ERO-রা বাধ্য থাকবেন। প্রয়োজনে নথিপত্রের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে আদালত মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, শুনানিতে জমা দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ৮,৫৫০ জন গ্রুপ-বি আধিকারিককে মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে জেলা শাসক বা ERO-দের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। এই আধিকারিকদের মধ্য থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রো-অবজারভার হিসেবে নির্বাচন করতে পারবে। তাঁদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো হবে। কাজের ধরন ও দায়িত্ব নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশনই। কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাঁদের বদলানোর স্বাধীনতাও কমিশনের থাকবে।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের তরফে জমা দেওয়া হলফনামায় অভিযোগ করা হয়েছে, SIR প্রক্রিয়া চলাকালীন নির্বাচন কর্মীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে, নোটিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের ডিজিপি পীযুষ পান্ডেকে নোটিস জারি করে ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। কমিশনের দাবি, একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও এই ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কোনো এফআইআর দায়ের করা হয়নি। আদালত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ১৯ জানুয়ারির আগের নির্দেশে ডিজিপিকে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল।
শুনানিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে আইনজীবী শ্যাম দিবান আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাইরে থেকে মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগের ফলে যোগ্য ভোটারদের “বড় আকারে বাদ পড়ার” সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই না ব্যাপকভাবে ভোটার বাদ পড়ুক।” আদালত এই আশঙ্কা নথিভুক্ত করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আইন অনুযায়ী ERO-দের হাতেই থাকবে।
এই মামলায় তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের পাশাপাশি সনাতনী সংসদ, কবি জয় গোস্বামীসহ আরও কয়েকজনের পক্ষ থেকেও আবেদন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে মুখ্যমন্ত্রী নিজে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়ে অভিযোগ করেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গকে লক্ষ্য করে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে এবং নামের বানানগত ছোটখাটো ত্রুটির কারণে অনেকের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্পূর্ণ পরিস্থিতি এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতেই চলছে। বাড়তি সময়সীমা ও নতুন নির্দেশের পর SIR প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই এখন দেখার।












