‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও…’ বসন্ত উৎসব ও রবিঠাকুর

টিঙ্কু মণ্ডল: ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল…’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি পর্যায়ের বিভিন্ন গানে দোলযাত্রার (Basanta Utsav) উল্লেখ রয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে শান্তিনিকেতনে এই প্রথাগত ...

By Kolkata24x7 Team

Published:

Follow Us
rabindranath-tagore-basanta-utsav-santiniketan-dol-festival

টিঙ্কু মণ্ডল: ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল…’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি পর্যায়ের বিভিন্ন গানে দোলযাত্রার (Basanta Utsav) উল্লেখ রয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে শান্তিনিকেতনে এই প্রথাগত দোল উৎসবকে নতুন রূপ দেন তিনি । ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে নাম দেওয়া হয় বসন্ত উৎসব।

জানা যায়, ১৯২৩ সালে শান্তিনিকেতনের আশ্রম-সম্মিলনীতে প্রথম বসন্তোৎসবের আসর বসে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, ১৯০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বসন্তপঞ্চমীতে, শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে যে ঋতু উৎসবের সূচনা হয়, তারই পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রূপ শান্তিনিকেতনের আজকের এই বসন্ত উৎসব বা বসন্তোৎসব। বাঙালির দোল উৎসবের এক নিঃশব্দ বিবর্তন। যা একমাত্র প্রত্যক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের এই শান্তিনিকেতনেই। হোলির দিনে যখন দিকে দিকে উদ্দামতা, শান্তিনিকেতনে তখন সুশৃঙ্খল আনন্দগান ও নাচের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় বসন্ত উৎসব।

   

তারপর থেকে বঙ্গজীবনে দোলযাত্রার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে বসন্ত উৎসব। দেশজুড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রঙ খেলা হয়। প্রধানত ব্রজ অঞ্চলে লঠমার ও ফুলের হোলি,বাংলা ও ওড়িশায় দোলযাত্রা,বিহারে ফাগুয়া এবং মণিপুরে ইয়াওসাং নামে খ্যাত। এছাড়া মহারাষ্ট্রে রঙপঞ্চমী,পঞ্জাবে হোলা মহাল্লা,গোয়াতে সিমগো এবং দক্ষিণ ভারতে মঞ্জল কুলি (কেরালা) নামে পরিচিত।

rabindranath-tagore-basanta-utsav-santiniketan-dol-festival

প্রকৃতির অকৃত্রিম দানে নবরূপে সেজে উঠছে বসন্ত। আর প্রতিটি ঋতুর মতোই বসন্তের সঙ্গে নিবিড় যোগ শান্তিনিকেতনের। এখানে বসন্তের এক আলাদা অনুভূতি। চার দিকে দেখলেই মনে হবে এ যেন নানা রঙের বসন্ত। ফাগুন হাওয়ার দোল লেগেছে বাংলার নিসর্গ প্রকৃতিতে। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠছে প্রকৃতির সবুজ অঙ্গন। এটি নিছক রঙের খেলা নয়, বরং প্রকৃতির মিলন ও অনাড়ম্বর উৎসব । বাঙালির দোল উৎসবের এক নিঃশব্দ বিবর্তন, যা একমাত্র প্রত্যক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের এই শান্তিনিকেতনেই।

‘বসন্ত এসে গেছে…’ বাঙালির বসন্ত মানেই দোল,আর দোল মানেই নানান রঙের সমাহার। কথায় আছে বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। সেই তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম প্রিয় উৎসব হল দোল । দোলের রঙ মানে শুধুই লাল,নীল,হলুদ,সবুজ ইত্যাদি রঙের বাহারকে বোঝায় না,দোলের রঙের সঙ্গে মিশে থাকে ভালোবাসার রঙ,পলাশ ফুলের কমলা রঙ,বসন্তের কাগজী ফুলের সাদা ও বেগুনী রঙ, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়ার হলুদ ও লাল রঙ ।

দোল শুধুমাত্র বাঙালির উৎসব নয়, দেশজুড়ে এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানীর হাত ধরে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম জগত সংসারকে বুঝিয়েছেন প্রেমের নির্দিষ্ট কোনও রঙ হয় না,সব রঙেই প্রেম রঙিন। যদিও পুরাণ মতে শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় রঙ হলুদ এবং শ্রীরাধারানীর প্রিয় রঙ লাল। তবে শ্রীকৃষ্ণ রাধারানীর প্রিয় রঙকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। তাই আজকের দিনেও সমগ্র বিশ্বব্রহ্মভান্ডে লাল রঙকেই ভালোবাসার রঙ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। হোলিতে দেশজুড়ে মানুষ একে অপরকে রঙ লাগানোর খেলায় মেতে ওঠে । প্রকৃতি যেমন ফাগুনের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে,বসন্ত উৎসবেও মানবজীবনেও রঙের উদয় হয়।

বাঙালির কাছে বসন্তের দোল উৎসব আরও রঙিন হয়ে উঠেছে রবি ঠাকুরের রচনাবলীতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছদ্মনামে আত্মপ্রকাশ করেছেন। যার মধ্যে অন্যতম হল ‘ভানুসিংহ’। রবীন্দ্ররচনা ‘ভানুসিংহের পদাবলী’তে আমরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমের বিভিন্ন ভাবের উল্লেখ পাই। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ফাগুনের হাওয়ায় বসন্তের রঙ এবং দোলের রংকে একে অপরের সঙ্গে মিলিয়েমিশিয়ে প্রকৃতিকে এক নতুন রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন। তাঁর রচিত এই রঙের প্রকাশ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় জায়গা বোলপুর শান্তিনিকেতনে। সেখানের আকাশ বাতাস যেন তাঁর রচনার রঙে নিজেদেরকে সম্পূর্ণ অন্যরকমভাবে তুলে ধরে। আর তাই এই দোল উৎসবের সময় শান্তিনিকেতন হয়ে ওঠে রঙের মহামিলন তীর্থ।

Kolkata24x7 Team

আমাদের প্রতিবেদন গুলি kolkata24x7 Team এর দ্বারা যাচাই করে লেখা হয়। আমরা একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম যা পাঠকদের জন্য স্পষ্ট এবং সঠিক খবর পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য এবং সাংবাদিকতার মান সম্পর্কে জানতে, অনুগ্রহ করে আমাদের About us এবং Editorial Policy পৃষ্ঠাগুলি পড়ুন।

Follow on Google