অসমে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) কার্যকর হওয়ার পর এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি হল (CAA citizenship rare case)। শ্রীভূমি জেলার এক ৪০ বছর বয়সি মহিলা, যিনি ২০০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, সম্প্রতি ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। তাঁর সঙ্গে একই দিনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন কাছাড় জেলার ৬১ বছর বয়সি এক পুরুষ। রাজ্যে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
শিলচরের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব জানিয়েছেন, শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই দুই ব্যক্তির নাগরিকত্বের শংসাপত্র জারি করেছে। আইন অনুযায়ী, এই ধরনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব কার্যকর ধরা হয় ভারতে প্রবেশের তারিখ থেকেই। সামাজিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে দুই ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
আইনজীবী মহলের মতে, শ্রীভূমি জেলার ওই মহিলার ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অসমে সিএএর অধীনে “রেজিস্ট্রেশন রুট”-এ নাগরিকত্ব পাওয়ার নজির হাতে গোনা। জানা গিয়েছে, ‘ব্যানার্জি’ পদবি ব্যবহারকারী ওই মহিলা ২০০৭ সালে এক আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এসেছিলেন। সেই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় শ্রীভূমি জেলার এক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে। পরবর্তীতে তাঁদের বিয়ে হয় এবং তাঁরা অসমেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে।
যদিও তাঁর পরিবারের বড় অংশ এখনও বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বসবাস করেন, তবুও বহুদিন ধরেই তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে সিএএর নিয়ম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিনি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন।
তবে প্রথমবার তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কারণ লোকসভা নির্বাচনের আগে হওয়া আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। বদরপুর এলাকা শ্রীভূমি জেলা থেকে আংশিকভাবে কাছাড় জেলায় চলে যাওয়ায় কর্তৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরে সংশোধন করে পুনরায় আবেদন করলে তা অনুমোদিত হয়।
ধর্মানন্দ দেব জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-এর ৫(১)(সি) ধারা ও ৬বি ধারার অধীনে তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় কোনও বিদেশি নাগরিক, যদি ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করে অন্তত সাত বছর ভারতে ধারাবাহিকভাবে বসবাস করেন, তবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেতে পারেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ১৯৭৫ সালে ১১ বছর বয়সে বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে ভারতে আসেন। পরে শিলচরে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে “ন্যাচারালাইজেশন” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
এই দুই অনুমোদনের ফলে ১৯৭১ সালের কাট-অফ তারিখের পরে অসমে প্রবেশ করেও সিএএর আওতায় নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল মাত্র চারজন। ধর্মানন্দ দেব জানান, গত ১৮ মাসে তিনি প্রায় ২৫ জন আবেদনকারীকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ আবেদন এখনও ঝুলে আছে বা বাতিল হয়েছে।
২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া সিএএ অসমে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। নিয়ম প্রকাশের পর এখনও পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৪০ জন আবেদন করেছেন। অথচ প্রায় দুই লক্ষ মানুষ এখনও ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিকবার দাবি করেছেন, অধিকাংশ হিন্দু অভিবাসী ১৯৭১ সালের আগেই অসমে প্রবেশ করেছিলেন।
এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজেপি নেতা শিলাদিত্য দেব। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যসভার সাংসদ সুস্মিতা দেব অভিযোগ তুলেছেন, বিভিন্ন রাজ্যে সিএএ কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিজেপির দ্বিচারিতা রয়েছে। সব মিলিয়ে, এই বিরল নাগরিকত্বের ঘটনা ফের সিএএ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে।




















