Home World ‘জুলাই-যোদ্ধা’দের বন্ধুত্বের বার্তার পরেও নেপালে বাংলাদেশ বিরোধী বিক্ষোভ—দক্ষিণ এশিয়ায় কি সমীকরণ বদলাচ্ছে?

‘জুলাই-যোদ্ধা’দের বন্ধুত্বের বার্তার পরেও নেপালে বাংলাদেশ বিরোধী বিক্ষোভ—দক্ষিণ এশিয়ায় কি সমীকরণ বদলাচ্ছে?

পদ্মাপারে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগে উত্তাল কাঠমান্ডু-সহ একাধিক শহর। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে বাংলাদেশ বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী গোষ্ঠীর তরফে দাবি করা হয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডু ছাড়াও পোখরা, বিরাটনগর, ললিতপুর-সহ একাধিক শহরে সাম্প্রতিক দিনে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। বিক্ষোভকারীদের একাংশ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

Advertisements

প্রতিবাদকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, ভয়ভীতি ও সামাজিক চাপ বেড়েছে। মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘরে হামলা এবং জোর করে এলাকা ছাড়ার মতো অভিযোগ সামনে এসেছে বলে তাদের বক্তব্য। যদিও বাংলাদেশের প্রশাসন ও সরকারের তরফে একাধিকবার বলা হয়েছে, এই ধরনের অভিযোগ অতিরঞ্জিত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

   

নেপালে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বিশেষভাবে উঠে এসেছে “দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড”-এর প্রসঙ্গ। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই ঘটনাটি সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যদিও এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে বাংলাদেশে ভিন্ন মত রয়েছে এবং সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবুও নেপালের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এটিকে সামনে রেখে প্রতিবাদ জোরদার করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ মাত্র দেড় বছর আগেই নেপালের সঙ্গেই বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশের তথাকথিত “জুলাই আন্দোলন” বা “জুলাই-যোদ্ধা” গোষ্ঠী। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তার নেতৃত্বদানকারী অংশ নিজেদের “জুলাই-যোদ্ধা” হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করে। সেই সময় ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থানকে কেন্দ্র করে তারা নেপালের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ঐক্যের বার্তা প্রচার করেছিল।

সে সময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় যে ভারত-বিরোধিতা কোনও ধর্মীয় অবস্থান নয় এবং হিন্দু প্রধান দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্কই তার প্রমাণ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, তাদের লড়াই রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত, ধর্মভিত্তিক নয়। নেপালকে সামনে রেখে সেই বয়ান জোরদার করা হয়েছিল।

এরও আগে বাংলাদেশে “বয়কট ভারত” আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তুললেও বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন সফল হয়নি বলে বিশ্লেষকদের মত। তবে ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারত-বিরোধী মনোভাব সমাজের একাংশে প্রভাব ফেলেছিল। ২০২৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীনও বাংলাদেশের কিছু অংশে ভারত-বিরোধী স্লোগান ও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, যাকে অনেকেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

জুলাই আন্দোলনের পর সেই বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়। ধর্মীয় পরিচয় আড়াল রেখে আঞ্চলিক কূটনীতি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যুক্তি তুলে ধরা হয়। সেই প্রেক্ষিতেই নেপালকে “বন্ধু রাষ্ট্র” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। নেপালে সরকার পরিবর্তনের পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণেও রদবদল হয়েছে। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলের একাংশের দাবি, অতীতে নেপালের মাটিতে সক্রিয় কিছু ভারত-বিরোধী নেটওয়ার্ক এখন নিষ্ক্রিয় হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক কিছু তৎপরতা নিয়েও কাঠমান্ডু আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের ইঙ্গিত।

এই আবহেই নেপালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক সময় যে দেশকে সামনে রেখে ভারত-বিরোধী কৌশল সাজানো হয়েছিল, সেই নেপালেই এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য বারবার জানিয়েছে, দেশটিতে সব ধর্মের নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করেন এবং কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িক হিংসা রাষ্ট্র সমর্থিত নয়। পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আবেদনও জানানো হয়েছে।

তবে বাস্তবে নেপালে চলা এই বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন চাপ তৈরি করছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের। এক সময়ের “বন্ধুত্বের বার্তা” দেওয়া দেশেই যখন প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে, তখন জুলাই আন্দোলনের আদর্শ ও অবস্থান নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

Advertisements