
রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) পাকিস্তানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করল ভারত। ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও দীর্ঘদিনের সীমান্ত-পার সন্ত্রাসবাদকে এক সুতোয় বেঁধে কড়া বার্তা দিল নয়াদিল্লি। মঙ্গলবার ‘Leadership for Peace’ শীর্ষক খোলা বিতর্কে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পার্বতানেনি স্পষ্ট করে জানান, পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সঙ্কট ও সন্ত্রাসে মদত দেওয়া নীতির মধ্যে গভীর যোগ রয়েছে।
ইমরান খানের কারাবন্দি অবস্থার প্রসঙ্গ
ভারতের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবন্দি অবস্থার প্রসঙ্গ। পার্বতানেনি জানান, ২০২৩ সালের অগস্ট থেকে ১৯০ মিলিয়ন ইউরোর দুর্নীতি মামলায় জেলে রয়েছেন ইমরান খান। পাশাপাশি ৯ মে, ২০২৩-এর অশান্তির ঘটনায় সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন, আদিয়ালা জেলে ইমরান খানের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগ নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্যাতন বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থাকে বিদ্ধ করে পার্বতানেনি বলেন, “পাকিস্তান জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান জানায় এক অদ্ভুত উপায়ে— একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে জেলে ভরে, তাঁর দলকে নিষিদ্ধ করে এবং সেনাবাহিনীকে দিয়ে ২৭তম সংশোধনের মাধ্যমে কার্যত এক সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে।” ওই সংশোধনীর মাধ্যমে পাক সেনাপ্রধান অসিম মুনিরকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ
একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের মন্তব্যকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে খারিজ করে দেয় ভারত। পার্বতানেনির বক্তব্য, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এবং এই বিষয়ে পাকিস্তানের বারবার মন্তব্য তাদের ভারতের ক্ষতি করার ‘অবসেশন’-এরই প্রমাণ। তাঁর কটাক্ষ, “যে দেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়েও প্রতিটি মঞ্চে বিভাজনমূলক এজেন্ডা নিয়ে আসে, তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না।”
পাকিস্তানকে ‘বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতের প্রতিনিধি সিন্ধু জলচুক্তি আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগামে ধর্মের ভিত্তিতে চালানো জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ নাগরিক নিহত হন। পার্বতানেনির কথায়, “৬৫ বছর আগে সদিচ্ছার ভিত্তিতে সিন্ধু জলচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ভারত। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধ ও হাজার হাজার সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে চুক্তির মূল ভাবনাকেই লঙ্ঘন করেছে। তাই পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্যভাবে সীমান্ত-পার সন্ত্রাস বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের দাবি
পাকিস্তানকে আক্রমণের পাশাপাশি রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের দাবিও জোরালোভাবে তোলে ভারত। আট দশক পুরনো এই কাঠামো বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন পার্বতানেনি। রাষ্ট্রসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “দাদা-দাদিদের জন্য তৈরি ব্যবস্থা দিয়ে নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ গড়া যায় না।”
ভারতের দাবি, নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিনিধিত্বহীন ও কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অঞ্চলগুলির জন্য দরজা খুলতে হবে। এ জন্য সময়সীমাবদ্ধ ও লিখিত আলোচনার পথে এগোনোর আহ্বান জানায় নয়াদিল্লি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতার প্রশ্নে ভারত তার দীর্ঘদিনের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করে দেয়, পাশাপাশি রাষ্ট্রসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ভারতের অবদানের কথাও তুলে ধরে।










