মহাভারতের মাহাত্ম্য বোঝাতে লাহোরে গীতাপাঠের পরিকল্পনা

gita-recitation-mahabharata-lahore-university

লাহোর: দেশভাগের পর এই প্রথম পাকিস্তানের শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় (Gita recitation at Lahore University)এল সংস্কৃত—আর তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মহাভারত ও গীতার পাঠ। লাহোরের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Lahore University of Management Sciences (LUMS) চার ক্রেডিটের একটি সংস্কৃত কোর্স চালু করেছে। এই উদ্যোগেরই পরবর্তী ধাপে মহাভারতের দর্শন ও নৈতিক বোধ ব্যাখ্যা করতে গীতাপাঠের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিন মাসের একটি উইকএন্ড ওয়ার্কশপে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা দেওয়ার পর সংস্কৃতকে নিয়মিত পাঠ্যক্রমে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোর্সে ভাষা ও ব্যাকরণের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্য-ঐতিহ্য বোঝানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের উর্দু অনুবাদে জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকের থিম সং Hai katha sangram ki শোনানো হচ্ছে—যাতে মহাভারতের কাহিনি ও ভাবধারা সহজে অনুধাবন করা যায়।

   

শিকড়ের টানে সংস্কৃত পড়ানো শুরু করছে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়

লুমসের গুরমানি সেন্টারের ডিরেক্টর ড. আলি উসমান কাসমি জানান, পাকিস্তানের কাছে সংস্কৃত গবেষণার এক বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। তাঁর কথায়, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে থাকা সংস্কৃত তালপাতার পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ আর্কাইভ।

১৯৩০-এর দশকে গবেষক জে.সি.আর. উলনার এই সংগ্রহের তালিকা প্রস্তুত করলেও ১৯৪৭ সালের পর কোনও পাকিস্তানি গবেষক সেখানে নিয়মিত কাজ করেননি। ফলে বিদেশি গবেষকরাই এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করে এসেছেন। স্থানীয়ভাবে গবেষক তৈরি হলে এই অবস্থা বদলাবে বলেই আশাবাদী তিনি।

এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে Mahabharata এবং Bhagavad Gita-কে কেন্দ্র করে পৃথক কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ড. কাসমির মতে, আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে পাকিস্তানভিত্তিক গীতা ও মহাভারত গবেষক তৈরি হওয়া একেবারেই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। লাহোরে গীতাপাঠের এই পরিকল্পনাকে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ফর্মান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সমাজবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহিদ রশিদ। তিনি জানান, আরবি ও ফারসি শেখার পর তিনি সংস্কৃত অধ্যয়নে মন দেন। অনলাইন মাধ্যমে কেমব্রিজ ও অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতনামা সংস্কৃতবিদদের কাছে পড়াশোনা করে প্রায় এক বছরে ধ্রুপদি সংস্কৃত ব্যাকরণ আয়ত্ত করেছেন—তবে শেখা এখনও চলছে।

ড. রশিদের কথায়, অনেকেই প্রশ্ন করেন কেন তিনি সংস্কৃত শিখছেন। তাঁর উত্তর, “এটি আমাদের পুরো অঞ্চলের বন্ধন-ভাষা। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ Panini এই অঞ্চলেই জন্মেছিলেন। সিন্ধু সভ্যতার সময়েও এখানে বহু রচনা হয়েছে। সংস্কৃত একটি সাংস্কৃতিক স্মারক—পর্বতের মতো। এটি কোনও একক ধর্মের নয়, আমাদের যৌথ ঐতিহ্য।”

তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ যদি একে অপরের শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য জানতে আগ্রহী হয়, তবে ভাষা বিভেদের দেয়াল ভেঙে সেতু গড়ে উঠতে পারে। “ভারতে যদি আরও বেশি মানুষ আরবি শেখেন, আর পাকিস্তানে মুসলিমরা যদি সংস্কৃত ও গীতা পড়েন—তাহলে মহাভারতের নৈতিক বোধ ও গীতার দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছবে,”—বলেছেন তিনি। লাহোরে গীতাপাঠের এই পরিকল্পনাকে তাই অনেকেই দেখছেন উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক সংলাপের এক আশাব্যঞ্জক সূচনা হিসেবে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন