শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ঘিরেই প্রায় তিন দশক ধরে আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। দু’জনেই প্রধানমন্ত্রী, দু’জনেই নিজেদের সময়ের রাজনীতিতে প্রভাবশালী মুখ। কিন্তু সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের পরে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও এক মহিলার উত্থানের সময় এসে গিয়েছে? বিএনপি চেয়ারপার্সনের নাতনি, তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নই জোরালো করছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন করে চাঙ্গা বিএনপি। তবে তারেকের ফেরা একার নয়-সঙ্গে দেশে এসেছেন স্ত্রী জুবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। সেই মুহূর্ত থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে জাইমা।
লন্ডন থেকে ফেরার সময় বিমানবন্দরে বাবা-মেয়ের একসঙ্গে ছবি, দেশে ফিরে তারেকের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে উপস্থিতি, এমনকি দলীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ-সব মিলিয়ে জাইমার ভূমিকা নিয়ে কৌতূহল বাড়তে শুরু করে। সেই জল্পনায় আরও ইন্ধন জুগিয়েছে তাঁর সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট। সেখানে জাইমা লিখেছেন, “আমি কখনওই নিজের শিকড় ভুলিনি। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে আমিও বড় ভূমিকা পালন করতে চাই।” এই মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা-তবে কি সক্রিয় রাজনীতিতে নামতে চলেছেন তারেককন্যা?
শনিবার বাবার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভোটার হিসেবেও নাম নথিভুক্ত করেছেন জাইমা। বিএনপি সূত্রে দাবি, তিনি শুধু প্রতীকী উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ নন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে তাঁকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নতুন কিছু নয়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পর জাইমার উত্থান স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করছেন তাঁরা। অতীতে, আওয়ামি লিগ সরকারের সময় বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়লে এবং খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকাকালীন, জুবায়দা রহমানের রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়েও জল্পনা হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত দল পরিচালনার ভার লন্ডন থেকেই সামলেছেন তারেক রহমান। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণ বদলাতে পারে বলেই ধারণা।
তবে অবিলম্বে শীর্ষ নেতৃত্বে জাইমার উত্থান হবে-এমন ধারণা খুব একটা জোরালো নয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আপাতত তারেক রহমানকে সামনে রেখেই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে চাইছে বিএনপি। দেশে ফেরার পর তারেকের বক্তব্যে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বার্তাকে পুঁজি করেই ভোটের ময়দান প্রস্তুত করছে দল।
অন্যদিকে, ভিন্ন মতও রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহে সাধারণ মানুষের বড় অংশ স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতৃত্ব চাইছে। তারেক রহমান অতীতে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হলেও বর্তমানে সেসব মামলা থেকে মুক্ত। তবু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, তত তাঁর রাজনৈতিক অতীতকে হাতিয়ার করতে পারে জামাত বা এনসিপির মতো বিরোধী শক্তি। সেই তুলনায় জাইমা রহমান একেবারেই ‘ক্লিন ইমেজ’-এর প্রতীক। পেশায় ব্যারিস্টার জাইমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত মুখ, যা তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
জাইমার রাজনৈতিক উপস্থিতি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২১ সালে আওয়ামি লিগ নেতা ও তৎকালীন মন্ত্রী মুরাদ হাসানের বিতর্কিত মন্তব্যের পর প্রথমবার শিরোনামে আসেন তিনি। সেই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয় মুরাদ হাসানকে। সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনের সময়ও সামাজিক মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে জাইমাকে। এমনকি ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’-এ তাঁর উপস্থিতিও নজর কেড়েছে।
দলীয় কর্মসূচিতেও সক্রিয় জাইমা। গত নভেম্বর মাসে বিএনপির একাধিক বৈঠকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন তিনি। ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রবাসী ভোটারদের বৈঠকেও বক্তব্য রাখেন তারেককন্যা। অর্থাৎ, সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে না নামলেও, রাজনৈতিক ময়দানে তাঁর পদচারণা অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে মেয়ের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কৌশলী জবাব দিয়েছিলেন তারেক রহমান, “সময় এবং পরিস্থিতিই ঠিক করে দেবে।” এখন সেই সময় ও পরিস্থিতির দিকেই তাকিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল। শেখ হাসিনা ও খালেদার পর কি জাইমা রহমান-এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সম্ভবত খুব শিগগিরই।


