বাংলাদেশে হিংসাই নিয়ম, ইউনূস অসহায়: চরমপন্থা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শেখ হাসিনার

Sheikh Hasina slams Muhammad Yunus

ঢাকায় সাম্প্রতিক হিংসার রেশ কাটতে না কাটতেই মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণে নামলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া, চরমপন্থীদের উত্থান এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে ইউনূস সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারকে বিঁধলেন হাসিনা

সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া একটি ই-মেল সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, র‍্যাডিকাল ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং তার পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অশান্তি বর্তমান শাসনব্যবস্থার ‘আইনহীনতার নগ্ন প্রতিফলন’। তাঁর দাবি, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সহিংসতা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে, অথচ অন্তর্বর্তী সরকার হয় তা অস্বীকার করছে, নয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।

   

“এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডই প্রমাণ করে, যে আইনহীনতার পরিবেশে আমার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল, তা ইউনূসের আমলে বহুগুণ বেড়েছে। আজ সহিংসতাই নিয়ম, আর সরকার নির্বিকার দর্শক। এর প্রভাব শুধু দেশের ভিতরেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গেও সম্পর্কে টান ধরছে,” বলেন শেখ হাসিনা। তাঁর কথায়, ভারত পরিস্থিতির দিকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে—সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিশৃঙ্খলা এবং গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত ভেঙে পড়তে দেখছে নয়াদিল্লি।

গুলি করা হয় শরিফ ওসমান হাদিকে

গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় রিকশায় যাওয়ার সময় খুব কাছ থেকে গুলি করা হয় শরিফ ওসমান হাদিকে। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে সিঙ্গাপুরে এয়ারলিফট করা হলেও ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। জুলাইয়ের গত বছরের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত হাদির মৃত্যু ঘিরে শাহবাগ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চরমপন্থী ইসলামি শক্তিকে শুধু প্রশ্রয়ই দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারও করছে। তাঁর দাবি, দণ্ডিত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এমনকি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলিকেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা দেওয়া হয়েছে।

“ইউনূস মন্ত্রিসভায় চরমপন্থীদের জায়গা দিয়েছেন, কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছেন দণ্ডিত জঙ্গিদের। বিদেশে এক ‘মধ্যপন্থী’ মুখোশ দেখিয়ে দেশের ভিতরে কঠোর মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে,” অভিযোগ শেখ হাসিনার। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতায় যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের সকলের জন্যই এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ যে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা আজ চরম হুমকির মুখে।

দীপু দাসের মৃত্যু

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও কড়া মন্তব্য করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক ভারতবিরোধী বিক্ষোভ, সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড এবং কূটনৈতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউনূস সরকারকে কাঠগড়ায় তোলেন তিনি। ২৭ বছরের দীপু দাসকে ব্লাসফেমির অভিযোগে পিটিয়ে খুন করা হয় এবং পরে দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়—এই ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে বলে মত তাঁর।

চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ঘটনার জেরে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়াকেও ‘ন্যায্য প্রতিক্রিয়া’ বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়ে উগ্রপন্থীরা সংখ্যালঘু, সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মিশনকে নিশানা করছে।

“একটি দায়িত্বশীল সরকার কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত এবং হুমকি দেওয়া দুষ্কৃতীদের শাস্তি দিত। কিন্তু এখানে তাদের ‘যোদ্ধা’ বলে অভিহিত করে কার্যত দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে,” বলেন তিনি।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা থাকলেও, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, ভাঙচুর এবং মিডিয়া অফিসে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এই অস্থিরতার মাঝেই শেখ হাসিনার মন্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপ আরও বাড়াল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন