
বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। ১৯৭৩ সালের আইনে গঠিত এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালটি নামের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দ জুড়ে নিলেও কার্যত এটি সম্পূর্ণ একটি দেশীয় আদালত—এমনই উঠে এসেছে আইসিটি–র বিভিন্ন নথি ও বিচার–প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণে।
আইসিটির গঠন, বিচারপদ্ধতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও ক্ষমতার ক্ষেত্র—সবই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী পরিচালিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা জাতিসংঘ–সমর্থিত ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে এর কাঠামোগত কোনও মিল নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার, সীমিত অধিকার, দ্রুত রায়—এসব নিয়েই বছরভর প্রশ্ন উঠেছে।
যুদ্ধাপরাধ থেকে জামাত–সংশ্লিষ্ট মামলা—দুই দশকের পরিসংখ্যান
নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে পর্যন্ত আইসিটি যেসব মামলায় বিচার করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি বিভাগ হল—১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ মামলা এবং জামাত–সংশ্লিষ্ট তদন্ত।
মোট ৩৬টি এফআইআর ICT Not International Tribunal
১৮৭ জন অভিযুক্ত, যার মধ্যে ৭৭ জন ফেরার, ৭১ জন গ্রেফতার
৭৭২টি অভিযোগ একত্রিত হয়ে ১০৫টি মামলা
তদন্ত সম্পন্ন ৭৪টি, তদন্তাধীন ২৭টি মামলা
বিচারাধীন অন্তত ৩৪টি মামলা
মোট ৪২টি রায়, দণ্ডিত ৭০ জন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ৬ জনের
পরিসংখ্যান অত্যন্ত বড় হলেও, আদালতের ‘আন্তর্জাতিক’ পরিচয়ের সঙ্গে বাস্তব কাঠামোর পার্থক্য থেকেই যায়।
কেন এই ট্রাইব্যুনাল ‘আন্তর্জাতিক’ নয়
১. সম্পূর্ণ দেশীয় আইন ও দেশীয় নিয়ন্ত্রণ
আইসিটি পরিচালিত হয় ১৯৭৩ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট’ অনুযায়ী।
এই আইন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২. বিচারক, প্রসিকিউটর—সবাই বাংলাদেশের
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মতো বহুজাতিক বিচারক, স্বাধীন পর্যবেক্ষক বা বিদেশি আইনজ্ঞ—কেউই নেই এখানে। সব নিয়োগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
৩. গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির অস্বাভাবিক ক্ষমতা
আইন অনুযায়ী, একজন বিচারকও সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক আদালতের নিয়মে এটি কখনও একক সিদ্ধান্ত নয়।
৪. বিদেশি আইনজীবীদের প্রবেশ নিষেধ
বহু আন্তর্জাতিক আইনজীবী ডিফেন্সের হয়ে লড়তে চাইলে অনুমতি পাননি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলির মতে, এটি স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করে না।
৫. মৃত্যুদণ্ডের বিধান
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে না।
আইসিটি সেই বিধান বহাল রেখেছে এবং প্রয়োগও করেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
আইসিটি–র রায় ঘোষণার সময়, মামলা বাছাই, বিচারপ্রক্রিয়া—সবই বহুবার রাজনৈতিক সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখা গিয়েছে। রায়ের গতি ও দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মহল এবং বহু মানবাধিকার সংগঠন।
বিশেষত যুদ্ধাপরাধ–সম্পর্কিত মামলাগুলিতে বিরোধী মতাদর্শের নেতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং একই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সরকারপন্থিদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়া—নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আরও তীব্র করেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বড় ব্যবধান
মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ—
সীমিত ক্রস–এক্সামিনেশন
হিয়ারসে–ভিত্তিক সাক্ষ্য
প্রমাণ সংগ্রহে ত্রুটি
রায়ের অস্বাভাবিক দ্রুততা
আন্তর্জাতিক আদালতের তুলনায় এগুলি অনেকটাই অস্বাভাবিক।
আইসিটি কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা পর্যবেক্ষিত নয়, এমনকি বিদেশি বিশেষজ্ঞ বা জাতিসংঘের সম্পৃক্ততাও নেই।










