বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে ফের তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক পোস্ট ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনের মধ্যেই অন্তত ১১ জন হিন্দু নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই তথ্যকে সামনে রেখে বলা হচ্ছে—গড়ে প্রতি দুই দিনে একজন করে হিন্দু খুন হচ্ছেন। যদিও সরকারের তরফে এই সংখ্যাকে “অতিরঞ্জিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করা হচ্ছে, তবু ধারাবাহিক হিংসার ঘটনাগুলি দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
একটি অ্যাক্টিভিস্ট গোষ্ঠী “Crack Platoon Bangladesh”-এর প্রকাশিত গ্রাফিক ও তালিকায় দাবি করা হয়, ১ ডিসেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় হিন্দু নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ওই তালিকায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যার পেছনে রয়েছে গণপিটুনি, স্থানীয় বিরোধ বা ধর্মীয় বিদ্বেষ। পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর আন্তর্জাতিক স্তরেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ১৮ ডিসেম্বর এক ব্যক্তি দীপু চন্দ্র দাসের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে, যাকে গণপিটুনিতে মারা হয়েছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে ২৫ ডিসেম্বর অমৃত মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির মারধরে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই দুই ঘটনাকে ঘিরে দেশ-বিদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কোথাও বলা হয়েছে, পরিস্থিতি “মব ভায়োলেন্স” বা উন্মত্ত জনতার হিংসার দিকে এগোচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এমনিতেই প্রশ্ন উঠছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, পুলিশের কার্যকারিতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় নিয়ে বিরোধী মহল ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে। সাম্প্রতিক এই অভিযোগগুলিকে সেই অস্থিরতারই ফল বলে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনাগুলিকে “ধর্মীয় রং” দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, বেশ কয়েকটি ঘটনায় ব্যক্তিগত শত্রুতা, অপরাধচক্র বা তথাকথিত “সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ” জড়িত থাকতে পারে। সরকারের তরফে বলা হয়েছে, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তাদের বক্তব্য, ঘটনার পরপরই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ আরও বাড়বে। সামাজিক মাধ্যমে বহু ব্যবহারকারী জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাকে ট্যাগ করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছেন।
অন্যদিকে, অনলাইন আলোচনায় তীব্র মেরুকরণও স্পষ্ট। একাংশ দাবি করছে, এই ধরনের পোস্ট মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মহলের “নির্বাচিত বর্ণনা”। তাদের বক্তব্য, একই সময়ে মুসলিম বা অন্যান্য গোষ্ঠীর ওপর হওয়া অপরাধের ঘটনাগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে বিষয়টি মানবাধিকার নয়, বরং রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি সংবেদনশীল রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে যেকোনও হিংসার ঘটনা—তা ধর্মীয় হোক বা সামাজিক—অতিরিক্ত গুরুত্ব পায় এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে। তথ্য যাচাই না করে সংখ্যা বা দাবি ছড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তবু বাস্তব সত্য হল, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা নতুন নয়। অতীতেও একাধিকবার হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর বা সামাজিক বয়কটের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই পুরনো ভয় আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের উচিত স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি, যাতে গুজব বা বিদ্বেষ আরও না ছড়ায়।
সব মিলিয়ে, “প্রতি দুই দিনে একজন করে হিন্দু খুন” — এই দাবিটি সত্য হোক বা বিতর্কিত, তা বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর অস্বস্তির ছবি তুলে ধরছে। স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং সংখ্যালঘুদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

