‘ব্যাটলিং বেগম’ যুগের অবসান: তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর পথে বাংলাদেশ

End of female duopoly in Bangladesh ঢাকা: বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮০ বছর বয়সে জীবনাবসান কেবল একটি ব্যক্তিগত বিয়োগান্তক ঘটনা নয়, বরং…

End of female duopoly in Bangladesh

End of female duopoly in Bangladesh

ঢাকা: বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮০ বছর বয়সে জীবনাবসান কেবল একটি ব্যক্তিগত বিয়োগান্তক ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিরল এক ‘নারী দ্বৈত শাসনের’ (Female Duopoly) অবসান ঘটল, যা গত তিন দশক ধরে দেশটির ক্ষমতা কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

Advertisements

‘ব্যাটলিং বেগম’ ও তিন দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ

১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে মূলত দুই মহীয়সীকে কেন্দ্র করে—বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। তাঁদের এই লড়াই আন্তর্জাতিক মহলে ‘ব্যাটলিং বেগম’ (Battling Begums) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। নির্বাচন, রাজপথের আন্দোলন, ভূ-রাজনীতি এমনকি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এই দুই নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাঁকুনি দিয়ে বিচার করা হতো।

   

খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নির্বাসন-এই দুই ঘটনা মিলে বাংলাদেশের ক্ষমতার অলিন্দে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা দেশটির ইতিহাসে গত ৩০ বছরে দেখা যায়নি। ১৯৯১-এর পর এই প্রথম বাংলাদেশ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কোনো মহিলা প্রধানমন্ত্রীর ছায়া ছাড়াই ভবিষ্যৎ পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে।

ব্যক্তিগত শোক থেকে রাজনৈতিক লড়াই End of female duopoly in Bangladesh

এই দুই নেত্রীর রাজনৈতিক উত্থান ছিল প্রায় একই সূত্রে গাঁথা, রক্তাক্ত ইতিহাস ও ব্যক্তিগত শোক। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নিহত হন শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

ব্যক্তিগত এই শোকই পরবর্তীতে কঠিন রাজনৈতিক সংকল্পে রূপ নেয়। আশির দশকের শেষে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁরা একবারই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ফেরার পর সেই মৈত্রী স্থায়ী হয়নি। শুরু হয় এক ‘জিরো-সাম’ পলিটিক্স বা চরম প্রতিহিংসার রাজনীতি, যেখানে পরাজয় মানেই ছিল কারাবরণ বা নির্বাসন।

উত্তরাধিকার ও লিঙ্গান্তরের পথে রাজনীতি

খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এখন সবার নজর বিএনপির উত্তরাধিকারী তারেক রহমানের দিকে। দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে নির্বাসিত তারেক রহমানই এখন দলের প্রধান মুখ এবং প্রত্যাশিতভাবে তিনিই হতে চলেছেন বিএনপির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী।

এই পরিবর্তনটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ১. পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন: তিন দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ সম্ভবত একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে। ২. উত্তরাধিকারের রাজনীতি: খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা—দুই নেত্রীই নারী ক্ষমতায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যক্তিত্ব এবং উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব কি সেই ‘লেগাসি’র বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?

রানীদের বিদায়, কিন্তু রাজবংশের কী হবে?

বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চ থেকে দুই ‘রানী’র বিদায় ঘটলেও তাঁদের রক্তধারা বা ডাইনেস্টি এখনও নেপথ্যে সক্রিয়। শেখ হাসিনার পুত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং খালেদা জিয়ার পুত্র ব্রিটেনে-উভয়েই দুর্নীতির ছায়ায় বিদ্ধ ও নির্বাসিত। খালেদা জিয়ার প্রস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা কি স্রেফ নতুন কোনো পারিবারিক উত্তরসূরির অভিষেক ঘটাবে, নাকি দেশ প্রকৃত অর্থে উত্তরাধিকারের রাজনীতি থেকে মুক্ত হবে? সময় তার উত্তর দেবে।

Advertisements