বাংলাদেশে ভোটের মুখে গুলিকাণ্ডে কেন ভারতের দ্বারস্থ ইউনুস প্রশাসন?

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক পরদিনই রাজধানী ঢাকায় ঘটে গেল এক ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলা। শুক্রবার প্রকাশ্য দিবালোকে তিনটি মোটরবাইকে এসে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা…

Dhaka Political Violence India Row

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক পরদিনই রাজধানী ঢাকায় ঘটে গেল এক ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলা। শুক্রবার প্রকাশ্য দিবালোকে তিনটি মোটরবাইকে এসে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা গুলি চালায় এক পরিচিত ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে। হামলার শিকার হন শরিফ ওসমান হাদি—ভারত-বিরোধী কট্টর নেতা, ‘অ্যান্টি শেখ হাসিনা ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী।

Advertisements

গুলিতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান হাদি। বর্তমানে তিনি কোমায় রয়েছেন। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

   

হামলার পর ভারত-যোগের দাবি, তবে প্রমাণ নেই: ঢাকা পুলিশ

হামলার কয়েক দিন পর রবিবার নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন দাবি তোলে—হামলাকারীরা ভারতে পালিয়ে গিয়ে থাকলে নয়াদিল্লিকে তাদের গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রক।

তবে একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) স্পষ্ট জানায়, এই মুহূর্তে হামলাকারীরা ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে—এমন কোনও যাচাই করা তথ্য তাদের হাতে নেই। ডিএমপির ডেপুটি কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, গোয়েন্দা শাখা-সহ একাধিক দল বিভিন্ন সূত্র ধরে তদন্ত চালাচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও অভিযুক্ত দেশ ছাড়িয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।

ফেসবুক পোস্টে বিস্ফোরক দাবি, বাড়ছে বিভ্রান্তি

এদিকে কাতার-ভিত্তিক এক বাংলাদেশি সাংবাদিক ফেসবুকে পোস্ট করে দাবি করেন, হামলায় যুক্ত দুই অভিযুক্ত ১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে অসমের গুয়াহাটিতে অবস্থান করছে। পোস্টে এক প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতার নামও উল্লেখ করা হয়। এমনকি একটি ভারতীয় ফোন নম্বর, সেলফি এবং লোকেশন সংক্রান্ত দাবিও সামনে আনা হয়।

তবে প্রশাসনিক স্তরে এই দাবির কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। উল্টে এই ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর অভিযোগ তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে পারে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ।

ভারত–বাংলাদেশ কূটনৈতিক টানাপোড়েন

হামলার সূত্র ধরে আরও একটি ইস্যুতে দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগ করে, অপসারিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত থেকে “উসকানিমূলক বক্তব্য” রেখে চলেছেন, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।

ভারত অবশ্য এই অভিযোগ খারিজ করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, ভারত কখনওই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কার্যকলাপে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। একই সঙ্গে ভারতের বিদেশমন্ত্রক জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারেরই দায়িত্ব—দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা।

অস্থির বাংলাদেশ, প্রশ্নের মুখে নির্বাচন

এই হামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক খুন, বোমা বিস্ফোরণ এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাঙ্কের দফতরের সামনে বোমা বিস্ফোরণ, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাদের উপর আক্রমণ—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মুখে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন হামলা শুধুই একজন ব্যক্তিকে নিশানা করা নয়, বরং গোটা রাজনৈতিক পরিসরে ভয়ের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল। এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

কে এই শরিফ ওসমান হাদি

শরিফ ওসমান হাদি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক চরমপন্থী ও বিতর্কিত মুখ। তিনি যেমন শেখ হাসিনা ও আওয়ামি লিগের তীব্র সমালোচক, তেমনই ভারত-বিরোধী বক্তব্যের জন্যও পরিচিত। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর নেতৃত্বে তিনি একাধিকবার আওয়ামি লিগকে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। এমনকি সম্প্রতি ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর মানচিত্র প্রকাশ করে নতুন বিতর্কও উসকে দিয়েছিলেন।

এখন ঢাকার একটি হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছেন হাদি। তাঁর উপর এই হামলা বাংলাদেশের ভঙ্গুর প্রাক্-নির্বাচনী পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে—এমনটাই মত রাজনৈতিক মহলের।

Advertisements