
ঢাকা: বাংলাদেশে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে রাজনৈতিক হিংসা ও অস্থিরতা৷ এদিকে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সূত্রগুলির মতে, সাম্প্রতিক অশান্তি নিছক জনরোষের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য দেশজুড়ে আতঙ্ক ও অস্থিরতার আবহ তৈরি করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর সন্দেহ জাগানো।
সূত্রগুলির দাবি, এই অস্থিরতা এমন সময় জোরালো করা হয়েছে, যখন মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠছে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতাকে সামনে রেখে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে—বাংলাদেশ বর্তমানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত নয়।
‘ম্যানেজড ইনস্টেবিলিটি’র কৌশল
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ম্যানেজড ইনস্টেবিলিটি’ বা নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতার পর্ব বলা যায়। এই কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য হল—বিচ্ছিন্ন মৃত্যু বা সহিংস ঘটনাকে দ্রুত রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত করা এবং সেটিকে ব্যবহার করে বৃহত্তর জনমোবিলাইজেশন ঘটানো। সূত্রগুলির মতে, উগ্রপন্থী ও বিরোধী শক্তি যৌথভাবে এই ছক প্রয়োগ করে রাজপথে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নিচ্ছে।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুব আন্দোলনের নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু। ১৮ ডিসেম্বর তাঁর হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রায় সমন্বিতভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমে প্রতিবাদের নামে জমায়েত হলেও তা দ্রুত রূপ নেয় সংগঠিত সহিংসতায়—অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাঙচুর এবং সরাসরি রাস্তার সংঘর্ষে।
টার্গেটেড সহিংসতা ও সংবাদমাধ্যমের উপর হামলা
নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইনপুট অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় জনতা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে, প্রাক্তন মন্ত্রীদের বাড়িতে হামলা চালায় এবং শাসকদলের সমর্থকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। উদ্বেগজনকভাবে, সহিংসতার নিশানায় আসে সংবাদমাধ্যমও। সূত্রের দাবি, প্রথোম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে। ঢাকায় জনতার হামলার মুখে পড়ে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিককে পরে উদ্ধার করতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদমাধ্যমকে টার্গেট করার উদ্দেশ্য দ্বিমুখী—একদিকে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা, অন্যদিকে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ভারত-বিরোধী আবেগকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা
বর্তমান অস্থিরতার আরেকটি স্পষ্ট মাত্রা হল তীব্র ভারত-বিরোধী বয়ানের উত্থান। চট্টগ্রামে ভারতের উপ-হাইকমিশনের আবাস ও অফিস লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্রের দাবি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলিতে উগ্রপন্থী উপাদানের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকায় একাধিক গোষ্ঠী ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে মিছিলের চেষ্টা করে, ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যায় এবং ভারত-বিরোধী স্লোগান তোলে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিরাপত্তা সূত্রগুলির মতে, কুশপুত্তলিকা দাহ, স্লোগান ও কূটনৈতিক স্থাপনায় আক্রমণের মাধ্যমে অশান্তিকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর লক্ষ্য—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কটে ভারতকে একটি প্রতীকী ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা।
পুলিশের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন
এই সহিংসতার প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও বিতর্কের কেন্দ্রে। একাধিক সূত্রের অভিযোগ, কিছু এলাকায় পুলিশ ছিল চোখে পড়ার মতো নিষ্ক্রিয়, আবার অন্যত্র কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই অসম প্রয়োগ পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ নয়, বরং নির্বাচিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এমন ধারণাকেই শক্তিশালী করছে।
গভীর রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা
পর্যবেক্ষকদের সতর্কবার্তা, বর্তমান অস্থিরতা বিচ্ছিন্ন সহিংসতার সমষ্টি নয়। এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকৌশলের ইঙ্গিত, যেখানে উগ্রপন্থী ও রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচন-পূর্ব অস্থির পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করছে, রাজপথে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কাঠামোগত সন্দেহ তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই অস্থিরতার ছায়া কাটিয়ে বাংলাদেশ আদৌ সময়মতো একটি শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কি না। প্রশ্নটি ক্রমশ শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।










