যে বাংলা দেশকে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের মতো রত্ন উপহার দিয়েছিল, আজ সেই বাংলা সিনেমা কেন নিজের পরিচয়ের জন্য লড়াই (Bengali cinema crisis) করছে?
কখনও কি ভেবে দেখেছেন, যে বাংলা একদিন ভারতীয় সিনেমাকে পথ দেখিয়েছিল, আজ সেই বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কেন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে? একসময় কলকাতার গলি থেকে উঠে আসা গল্পগুলোই বিশ্ব সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছিল। আর আজ সেই একই শহরের সিনেমা হলগুলো ভরে উঠছে বলিউড ও দক্ষিণী ছবির পোস্টারে।
যে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একসময় ভারতের সাংস্কৃতিক গর্ব ছিল, আজ সে কেন ধীরে ধীরে গুমনামির অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে? সাহিত্য সংকট, রাজনীতির হস্তক্ষেপ না কি বাইরের ইন্ডাস্ট্রির চাপ, আসল ‘ভিলেন’ কে? এই প্রতিবেদনে একে একে সেই সব কারণের খোঁজ করার চেষ্টা করব, যেগুলি মিলেই বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থার ভিত গড়ে দিয়েছে। এটি শুধু একটি ইন্ডাস্ট্রির পতনের গল্প নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সংস্কৃতির উপর নেমে আসা সংকটের কথাও।
যখন বাংলা সিনেমা ছিল আন্দোলন, শুধু বিনোদন নয়
আজকের বাস্তবতা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশকে। সেই সময় বাংলা সিনেমা শুধুমাত্র ছবি তৈরি করত না, সে ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালি’ মুক্তি পাওয়ার পর শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও বাংলা সিনেমা আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবি সম্মানিত হয় এবং বিশ্ববাসী প্রথমবার গ্রামবাংলার জীবনের নিখাদ, নির্মোহ চিত্র দেখার সুযোগ পায়।
‘পথের পাঁচালি’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’- এই অপু ট্রিলজির মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় প্রমাণ করেছিলেন, বড় সেট বা অতিরঞ্জিত মেলোড্রামা ছাড়াও গভীর গল্প বলা যায়। একই সময়ে ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে দেশভাগের যন্ত্রণা এমনভাবে তুলে ধরেন, যা আজও দর্শককে নাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে মৃণাল সেন তাঁর ছবির মাধ্যমে সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার নির্ভীক বিশ্লেষণ করেন।
এই তিন পরিচালকের হাত ধরে বাংলা সিনেমা এমন এক বৌদ্ধিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যেখানে পৌঁছনো অন্য ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রির কাছেও ছিল স্বপ্নের মতো। তখন উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের মতো তারকারা জনপ্রিয় ছিলেন ঠিকই, কিন্তু গল্প ও কনটেন্ট কখনও তারকাখ্যাতির আড়ালে হারিয়ে যায়নি।
সাহিত্য ছিল বাংলা সিনেমার প্রাণ
সত্যজিৎ রায়ের ছবির মূলে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের লেখা। ‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘চারুলতা’, সব ছবির ভিত্তি ছিল শক্তিশালী সাহিত্য। পরিচালকের কাজ ছিল সেই সাহিত্যকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্দায় তুলে ধরা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাহিত্যিক ভাণ্ডার ক্রমশ শুকোতে থাকে। নিজের শেষ জীবনে সত্যজিৎ রায় নিজেই সতর্ক করেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে গভীর পর্যবেক্ষণ ও তীক্ষ্ণ সামাজিক বোধ কমে যাচ্ছে। আজ তাঁর সেই আশঙ্কাই বাস্তব হয়ে উঠেছে।
উদারীকরণের পরবর্তী প্রজন্ম বড় হয়েছে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায়। মাতৃভাষা থেকে দূরত্ব বেড়েছে, বই পড়ার অভ্যাস কমেছে। নতুন সাহিত্যেও আগের মতো সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। আজকের অনেক নির্মাতাই স্বীকার করেন, বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় সংকট এখন লেখার অভাব।
রাজনীতি ও সিস্টেমের অদৃশ্য শিকল
সাহিত্য সংকটের পাশাপাশি রাজনীতির প্রভাবও বাংলা সিনেমাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে রাজনৈতিক প্রভাব শিল্পে ঢুকতে শুরু করে। শুরুতে ভাল সিনেমাকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘সংরক্ষণ’ রূপ নেয় নিয়ন্ত্রণে।
ফিল্ম সেটে কে কাজ করবেন, কীভাবে কাজ হবে, এসব অনেক সময় রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। স্বাধীন মত ও সৃজনশীলতা ক্রমশ সংকুচিত হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার এলেও এই হস্তক্ষেপ কমেনি। এর ফলে শিল্পের মূল্যায়ন কম হয়েছে শিল্পগুণে, বেশি হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ে।
রিমেক সংস্কৃতি ও বাইরের চাপ
নব্বইয়ের দশকে বলিউড এবং দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি বিশাল বাজেট ও বিপণনের মাধ্যমে গোটা দেশ দখল করতে শুরু করে। বাংলা সিনেমা এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তখন সহজ রাস্তা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় দক্ষিণী ছবির রিমেক।
এই রিমেক সংস্কৃতি বাংলা সিনেমার মৌলিকত্বকে বড় ধাক্কা দেয়। দর্শক ইতিমধ্যেই হিন্দি ডাব করা আসল ছবিগুলি দেখে ফেলতেন। ফলে দুর্বল কপি দেখার আগ্রহ হারান। এর ফলে দর্শক আরও দূরে সরে যায়।
ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের সমস্যা
সমস্যা শুধু বাইরের নয়। বড় প্রোডাকশন হাউসগুলির একচেটিয়া দখল, ডিস্ট্রিবিউশন মনোপলি, অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ইন্ডাস্ট্রিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ১৩৪টি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৪০-এ। এটি সংকটের গভীরতাই বোঝায়।
তবুও কি আশা বাকি?
সবকিছুর পরেও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। ২০২৪ সালে ‘খাদান’ ও ‘বহুরূপী’র মতো ছবির বক্স অফিস সাফল্য প্রমাণ করেছে, ভাল কনটেন্ট হলে দর্শক এখনও প্রেক্ষাগৃহে আসেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নতুন নির্মাতাদের সুযোগ দিচ্ছে। ‘মন্দার’-এর মতো সিরিজ সাহসী গল্প বলার উদাহরণ।
নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা প্রযুক্তি ও সাহিত্যকে মিলিয়ে নতুন পথ খুঁজছেন। সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ছবির প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলা সিনেমাকে কে শেষ করছে, এই প্রশ্নের কোনও একক উত্তর নেই। এটি বহু বছরের ভুল সিদ্ধান্ত, সাহিত্য সংকট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, রিমেক সংস্কৃতি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সম্মিলিত ফল।
আজ বাংলা সিনেমা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে হারিয়ে যাওয়ার পথ, অন্যদিকে নিজের শিকড়ে ফিরে নতুন করে দাঁড়ানোর সুযোগ। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা ঠিক করবেন নির্মাতা, শিল্পী এবং সর্বোপরি দর্শকরাই।




















