সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে ফের নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সমাজ এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), ২০১৯–এ আবেদন করা নাগরিকত্ব প্রত্যাশীদের ভোটাধিকারের প্রশ্নে। দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল—CAA–তে আবেদনকারী, কিন্তু যাঁদের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, তাঁরা কি রাজ্যের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন? এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও তৈরি হয়েছিল জটিলতা। অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরেই ভোটাধিকার পাওয়া সম্ভব। আদালতের এই মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে আত্মদীপ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আবেদন নিয়ে শুনানি হয়। তাঁদের দাবি ছিল—CAA–র নির্দেশিত সময়সীমা অনুযায়ী যাঁরা নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য এবং যাঁরা ইতিমধ্যেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে SIR (Special Inquiry Report) শেষ হলেই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। কিন্তু আদালত এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মত দিয়ে জানিয়ে দেয়—নাগরিকত্বের আবেদন বিচারাধীন থাকলে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, নাগরিকত্বের আবেদন জমা দিলেই ভোটাধিকার নিশ্চিত হয় না; নাগরিকত্ব সম্পূর্ণরূপে অনুমোদিত হওয়ার পরেই একজন ব্যক্তি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। এই পর্যবেক্ষণই মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
CAA বাস্তবায়নের প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সমাজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ রাজ্যের বড় অংশের মতুয়া সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিকত্বের স্পষ্টতা দাবি করে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য—তাঁরা বহু দশক ধরে ভারতে বাস করছেন, কর দিচ্ছেন, সরকারের বিভিন্ন স্কিমের সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু এখনও নাগরিকত্বের কাগজপত্রের স্পষ্টতা নেই। ফলে ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনে স্থায়ী উদ্বেগ তৈরি করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ মন্তব্যের পর তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ অধিকাংশ মতুয়া পরিবার CAA–তে আবেদন করলেও তাঁদের আবেদন এখনও বিচারাধীন। নাগরিকত্ব সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ভোটার তালিকায় যুক্ত হতে পারবেন কি না, সেই উত্তর আজও অস্পষ্ট।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকার CAA বাস্তবায়নের পর থেকে এই সমাজের সমর্থন পাওয়ার দাবি করে আসছে। আবার রাজ্যের শাসক দলও মতুয়াদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়েছে। CAA–তে আবেদনকারী লক্ষাধিক মানুষের ভোটাধিকার ঝুলে থাকলে তা সরাসরি নির্বাচন ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে—এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
যদিও কেন্দ্র পরিষ্কার করেছে যে CAA কার্যকর, কিন্তু নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগছে। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে ভোটের সময় অনিশ্চয়তা বাড়বে বলেই আশঙ্কা।ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, ভোট দেওয়ার অধিকার হলো নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। তাই নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হলে ভোটাধিকার দেওয়া সম্ভব নয়—এই যুক্তিই আদালত সামনে এনেছে। SIR রিপোর্টের ভিত্তিতে আপাতভাবে কারও পরিচয় যাচাই করা গেলেও তাতে নাগরিকত্ব নিশ্চিত না-ও হতে পারে। তাই আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে—নাগরিকত্ব অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কোনওভাবেই ভোটাধিকার দেওয়া সম্ভব নয়।
