
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের মাটির নিচে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল সম্পদের সম্ভাবনা (Gold discovery in West Bengal)এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনল জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI)। সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় রাজ্যের অন্তত ৯টি সম্ভাব্য স্বর্ণখনির (gold-bearing sites) অস্তিত্ব চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুলিয়ার রুদ্র (Rudra) প্রস্পেক্ট এলাকাকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আবিষ্কার রাজ্যের খনিজ সম্পদ, শিল্প বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
GSI-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পুরুলিয়ার রুদ্র এলাকায় আনুমানিক ১২.৮৩ মিলিয়ন টন আকরিক (ore) মজুত রয়েছে, যার মধ্যে থেকে প্রায় ৬৫০ কেজি সোনা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শিল্প ও রাজস্বের নিরিখেও তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্য হিসেবে দেখা হত। কয়লা ছাড়া বড় কোনও খনিজ সম্পদের উপস্থিতি নিয়ে তেমন আলোচনা ছিল না। কিন্তু GSI-এর এই সমীক্ষা সেই ধারণায় বড়সড় বদল আনতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই সম্ভাব্য সোনার খনিগুলির বাণিজ্যিক উত্তোলন সম্ভব হয়, তাহলে তা রাজ্যের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
রুদ্র ছাড়াও বাকি সম্ভাব্য স্বর্ণখনিগুলি মূলত পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ছোটনাগপুর মালভূমি সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বলে জানা গেছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে এই অঞ্চল ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার স্বর্ণবহনকারী বেল্টের সঙ্গে মিল রয়েছে, যা এই আবিষ্কারকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। GSI-এর আধিকারিকদের মতে, প্রাথমিক সমীক্ষা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন করা হবে।
এই আবিষ্কার ঘিরে শিল্পমহলেও বাড়ছে আগ্রহ। খনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার খনি চালু হলে সরাসরি কর্মসংস্থান যেমন তৈরি হবে, তেমনই পরোক্ষভাবে পরিবহণ, পরিকাঠামো, ছোট শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের মতো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকায় উন্নয়নের নতুন রাস্তা খুলে যেতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। খনন কাজ শুরু হলে বনাঞ্চল, জলসম্পদ এবং স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়েও সচেতন মহলের উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিবেশগত মূল্যায়ন (EIA) এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে তবেই এই প্রকল্পগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
রাজ্য প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ে যদি পরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্প রূপায়িত হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ খনিজ সম্পদের মানচিত্রে এক নতুন পরিচিতি পেতে পারে। যদিও এখনও বাণিজ্যিক খননের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও GSI-এর এই রিপোর্ট রাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, পুরুলিয়ার রুদ্র এলাকাকে কেন্দ্র করে যে সোনার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, তা শুধুমাত্র একটি ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কার নয়—বরং তা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি, শিল্প ও উন্নয়নের দিশা বদলে দেওয়ার এক সম্ভাবনাময় ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।






