কলকাতা: পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে সঙ্গীতশিল্পী লগ্নজিতা চক্রবর্তীর (artist harassed)হেনস্থার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের এক শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে উত্তাল রাজ্য। এবার ঘটনাস্থল নদিয়ার মাজদিয়া। অভিযোগ, একটি মেলার অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সময় উত্তরপাড়ার সঙ্গীতশিল্পী মধুবন্তী মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে প্রকাশ্যে মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মঞ্চে উঠে এক ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে ধর্ম ও জাতপাত নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটে গত ২১ ডিসেম্বর, রবিবার। মধুবন্তীর দাবি, নির্ধারিত অনুষ্ঠান অনুযায়ী তিনি মঞ্চে উঠে গান গাইছিলেন। সেই সময় আচমকা এক ব্যক্তি মঞ্চে উঠে পড়েন এবং রীতিমতো তাঁর হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নেন। শিল্পীর বক্তব্য, তাঁকে বলা হয় “এই ধর্মের গান আমরা শুনব না, জাতপাতের গান চলবে না। অন্য গান করুন।” প্রকাশ্য মঞ্চে এমন আচরণে হতবাক হয়ে যান তিনি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সঙ্গীতশিল্পীরা।
নৈহাটিতে বালি মাফিয়ার দৌরাত্বে বিপদে জুবিলী সেতু
মধুবন্তী মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আমাদের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটছে। জীবনে প্রথমবার এই ধরনের অভিজ্ঞতা। একজন উঠে এসে আমার হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিলেন, কী গান গাইব সেটাও তিনি ঠিক করে দিতে চাইলেন।” শিল্পীর অভিযোগ, ঘটনার সময় মঞ্চে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ঘটনার পর দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন আয়োজকরা। মাজদিয়ার ওই মেলা কমিটির সম্পাদক দেবাশিস বিশ্বাস জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চ থেকে নামিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়া হয়। মাইকে ঘোষণা করে জানানো হয়, এই মেলায় শিল্পীরা তাঁদের নিজের পছন্দের গান গাইবেন। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনায় অত্যন্ত আপসেট। এমন ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়, ঘটা উচিত হয়নি।”
তবে এই ঘটনার ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত পুলিশের কাছে কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি মধুবন্তী মুখোপাধ্যায়। তবুও বিষয়টি সামনে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একের পর এক শিল্পী কেন এই ধরনের হেনস্থার শিকার হচ্ছেন?
উল্লেখযোগ্যভাবে, ঠিক কয়েকদিন আগেই পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে একটি বেসরকারি স্কুলের অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী লগ্নজিতা চক্রবর্তী। সেই ঘটনায় অভিযুক্ত মেহবুব মল্লিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি, খুনের চেষ্টা সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মধুবন্তীর অভিযোগ নতুন করে আশঙ্কা উসকে দিয়েছে। তিনি ঘটনার তুলনা টেনেছেন প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে। মধুবন্তীর কথায়, “পাশের দেশে যেভাবে ছায়ানট গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, সেই ছবি আমরা দেখেছি। আজ যদি এই দেশে শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়া শুরু হয়, কাল কী হবে কে বলতে পারে? আমাদের গান গাওয়াই যদি বন্ধ হয়ে যায়, সেই আতঙ্ক কাজ করছে।”
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা প্রণয় রায় বলেন, “এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল সঙ্গীত ও শিল্পচর্চার পীঠস্থান। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে আজ শিল্পীরা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। কী গান গাওয়া যাবে, কী যাবে না এই ফতোয়া চলছে। এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ব্যর্থতা।”
সব মিলিয়ে, লগ্নজিতা চক্রবর্তীর পর মধুবন্তী মুখোপাধ্যায় দু’টি ঘটনার ধারাবাহিকতায় রাজ্যে শিল্পীর স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিসর নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। প্রকাশ্য মঞ্চে গান গাওয়ার সময় শিল্পীদের হেনস্থা হওয়া কি ভবিষ্যতের জন্য আরও অশনি সংকেত? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।


