কলকাতা: রাজ্যে SIR বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের পর খসড়া (West Bengal Voter List SIR)তালিকা প্রকাশিত হবে ১৬ ডিসেম্বর। ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা নিয়ে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) ঘিরে রাজনৈতিক তরজা নতুন নয়।
তবে ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে যে তথ্যগুলি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে, তা কার্যত রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরী করেছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা পড়া এনুমারেশন ফর্ম বিশ্লেষণ করে যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা শুধু চাঞ্চল্যকর নয় বরং ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
মেসির কলকাতা সফরে ঘিরে রণক্ষেত্র যুবভারতীতে চলল ভাঙচুর, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য, প্রায় ৮৫ লক্ষ ফর্মে ‘পিতা’ হিসেবে যে নামগুলি উল্লেখ করা হয়েছে, তার বড় অংশই সন্দেহজনক। অর্থাৎ, ওই নামগুলি বাস্তব অস্তিত্বহীন, পুনরাবৃত্ত বা অসংলগ্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই শেষ নয় ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার এনুমারেশন ফর্মে পিতা ও মাতার নাম একেবারে একই। প্রশাসনিক মহলে এই তথ্যকে ‘অসম্ভব ও অস্বাভাবিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে বয়স সংক্রান্ত তথ্যে। কমপক্ষে ১১ লক্ষ ৯৫ হাজার ফর্মে পিতার বয়স ১৫ বছরের কম দেখানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে ১৫ বছরের কম বয়সী কেউ কীভাবে বাবা হতে পারেন? এই ধরনের তথ্য যে পরিকল্পিত কারচুপির ইঙ্গিত দেয়, তা মানছেন প্রাক্তন নির্বাচন আধিকারিকদের একাংশ।
পরিসংখ্যান এখানেই থামে না। তথ্য অনুযায়ী, ২৪ লক্ষ পুরুষ ভোটারের ছয়টি করে সন্তান দেখানো হয়েছে। বাস্তবে জনসংখ্যাগত দিক থেকে এমন সংখ্যা অত্যন্ত বিরল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের তথ্যের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে একাধিক ক্ষেত্রে একই পরিবারের নামে একাধিক ভুয়ো ভোটার যুক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার ক্ষেত্রে ‘ঠাকুরদা’র বয়স ৪০ বছরের কম। সামাজিক ও জৈবিক বাস্তবতায় যা কার্যত অসম্ভব। নির্বাচন কমিশনের সূত্রে খবর, এই ধরনের অসংগতি সাধারণ ভুল নয়, বরং সুসংগঠিত তথ্য বিকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
এই সমস্ত তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে তবে কি এই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই SIR-এর বিরোধিতা করে আসছে? শাসকদলের দাবি, এই সংশোধন প্রক্রিয়া ‘ভোটারদের হয়রানি’ এবং ‘গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ’। কিন্তু বিরোধীদের পাল্টা বক্তব্য, SIR না হলে এই ভুয়ো ও অস্বাভাবিক তথ্য কোনও দিনই প্রকাশ্যে আসত না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই বিপুল সংখ্যক ভুয়ো বা ত্রুটিপূর্ণ এন্ট্রি চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের বহু আসনের নির্বাচনী অঙ্কে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও শহরতলির এলাকায় ভোটব্যবস্থার চরিত্রই বদলে যেতে পারে।
এখন সব নজর ১৬ ডিসেম্বরের দিকে। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর আপত্তি ও দাবির পর্যায়ে কী কী তথ্য সামনে আসে, তার উপরেই নির্ভর করবে রাজ্যের ভোটার তালিকার ভবিষ্যৎ। তবে এটুকু স্পষ্ট SIR রাজ্যের রাজনীতিতে শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এক গভীর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠেছে।
