
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে বেআইনি বালি কারবার ঘিরে বড়সড় আর্থিক কেলেঙ্কারির (GD Mining)পর্দা ফাঁস করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। কলকাতা জোনাল অফিস প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA), ২০০২-এর অধীনে ৩ জানুয়ারি ২০২৬ বিশেষ আদালতে প্রসিকিউশন কমপ্লেন (চার্জশিট) দাখিল করেছে জিডি মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড, সংস্থার কর্ণধার অরুণ সরাফ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে।
তার আগের দিন, ২ জানুয়ারি, এই মামলায় জিডি মাইনিং ও তাদের গ্রুপ সংস্থার নামে থাকা মোট ১৪৯টি স্থাবর সম্পত্তি অস্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত করে ইডি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা।
ইডির তদন্ত শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একাধিক এফআইআরের ভিত্তিতে। অভিযোগ ছিল—বালি চুরি, বেআইনি বালি উত্তোলন, অবৈধ মজুত এবং ভুয়ো নথির মাধ্যমে পরিবহণ। তদন্তে উঠে আসে, একাধিক সংস্থা জাল বা ভুয়ো ই-চালান ব্যবহার করে বালি পরিবহণ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইডির দাবি, এই চক্রের অন্যতম মূল হোতা জিডি মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং তাদের কর্ণধার অরুণ সারাফ।
বিশৃঙ্খলায় এজলাস ছাড়লেন বিচারপতি! আই প্যাক শুনানি মুলতুবি
তদন্তে ইডি যে ‘মোডাস অপারেন্ডি’ বা কাজের কৌশল চিহ্নিত করেছে, তা যথেষ্ট সংগঠিত ও পরিকল্পিত। অভিযোগ অনুযায়ী, একই ই-চালান ব্যবহার করে একাধিকবার বালি পরিবহণ করা হতো, কখনও আবার একটি চালান দেখিয়ে ডাবল ট্রিপ চালানো হতো। কোথাও কোথাও বালি মজুত ও বিক্রির ক্ষেত্রেও জাল নথির ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ বালি চুরি ও অবৈধ বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ আয় বা ‘প্রসিডস অফ ক্রাইম’ তৈরি হয়েছে বলে ইডির দাবি।
ইডি জানিয়েছে, তল্লাশি অভিযানের সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ডিজিটাল প্রমাণ উদ্ধার হয়েছে, যা এই বেআইনি বালি কারবারের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। উদ্ধার হওয়া নথি থেকে জানা যায়, বালি সংক্রান্ত এই বেআইনি কার্যকলাপের মাধ্যমে বিপুল অঘোষিত আয় করা হয়েছে, যার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা অভিযুক্তরা দিতে পারেননি।
তদন্তের অংশ হিসেবে ইডি সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (CPWD)-এর সহায়তা নেয়, যাতে সাম্প্রতিক সময়ে ঠিক কত পরিমাণ বালি চুরি হয়েছে, তার একটি নির্ভুল হিসেব করা যায়। বিভিন্ন নথি, হিসেবের গরমিল এবং অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে বারবার অসঙ্গতি ধরা পড়ে। অভিযুক্তরা এই আর্থিক গরমিলের যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া নিয়ে। ইডির অভিযোগ, বেআইনি বালি কারবার থেকে পাওয়া নগদ অর্থের একটি অংশ ক্যাশ ডিপোজিট এবং হিসাবনিকাশের কারসাজির মাধ্যমে ব্যবসায়িক আয়ের রূপ দেওয়া হয়। এই অর্থকে বৈধ দেখাতে নিয়মিত ব্যবসায়িক আয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ইডি তদন্ত শুরু করার পর অভিযুক্ত সংস্থাগুলি অতিরিক্ত নগদ জমার ব্যাখ্যা দিতে জিএসটি রিটার্নেও পরিবর্তন আনে বলে অভিযোগ।
এই বেআইনি আয়ের টাকাই ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি কেনার জন্য, যা জিডি মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং তাদের গ্রুপ সংস্থার নামে রয়েছে। সেই সমস্ত সম্পত্তিই বর্তমানে ইডির অস্থায়ী বাজেয়াপ্তির আওতায়।
উল্লেখ্য, এই মামলায় জিডি মাইনিংয়ের প্রোমোটার অরুণ সারাফকে আগেই, ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি বিচারাধীন হেফাজতে রয়েছেন। তদন্ত চলাকালীন একাধিক তল্লাশিতে এখনও পর্যন্ত ৯৯ লক্ষ টাকা নগদ, বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ডিজিটাল প্রমাণ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ইডি সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত এখানেই শেষ নয়। আরও ব্যক্তি ও সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের সঙ্গে যুক্ত শেল কোম্পানি, আর্থিক লেনদেনের স্তরবিন্যাস (লেয়ারিং) এবং অবৈধ অর্থের ব্যবহার সংক্রান্ত দিকগুলো নিয়েও গভীর তদন্ত চলছে।










