চলে গেলেন রবীন্দ্রসংগীতের প্রবাদপ্রতিম অর্ঘ সেন

কলকাতা: রবীন্দ্রসংগীতের জগতে আরও একটি যুগের অবসান হল আজ (Argha Sen)। যখনই রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গ উঠবে তখনই আসবে সেই গভীর, আত্মস্থ ও সুরেলা কণ্ঠের অর্ঘ্য সেনের নাম। সেই ...

By Sudipta Biswas

Published:

Follow Us
argha-sen-rabindra-sangeet-legend-passes-away

কলকাতা: রবীন্দ্রসংগীতের জগতে আরও একটি যুগের অবসান হল আজ (Argha Sen)। যখনই রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গ উঠবে তখনই আসবে সেই গভীর, আত্মস্থ ও সুরেলা কণ্ঠের অর্ঘ্য সেনের নাম। সেই কণ্ঠ আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর কলকাতার নিজের বাসভবনে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। ‘কে গো অন্তরতর সে’ রবীন্দ্রনাথের এই গান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে অর্ঘ সেনের কণ্ঠে। বুধবার সকাল ৭ টা নাগাদ তার জীবনাবসান হয়েছে।

তাঁর বয়স হয়েছিল নব্বই বছরের কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে যাঁদের জীবন একাকার হয়ে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অর্ঘ্য সেন ছিলেন এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র।১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর, তৎকালীন বাংলার ফরিদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন অর্ঘ্য সেন। আদি নিবাস খুলনার সেনহাটি গ্রামে। বাবা হেমেন্দ্রকুমার সেন ছিলেন কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক, আর মা বিন্দুদেবী সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী।

   

কেন্দ্রের প্রাক্তন মন্ত্রীর বাড়িতে ভয়াবহ আগুন, আশেপাশের এলাকায় আতঙ্ক

ছোটবেলা থেকেই সেই পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের গানের সুর বাজত। তবে অর্ঘ্য সেন কেবল সংগীতশিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যানবিদ। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, পরে ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশনে যুক্ত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করেছেন নিরন্তর, যেন দুটো জীবন একসঙ্গে চলেছে সমান্তরালভাবে।

তাঁর গানের শিক্ষা শুরু হয়েছিল পরিবারের কাছ থেকে, পরে বিভিন্ন গুণীজনের সান্নিধ্যে। রবীন্দ্রসংগীতের যে শুদ্ধ, নির্মল ও অন্তর্মুখী ধারা তা অর্ঘ্য সেনের কণ্ঠে যেন নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তিনি কখনো জোর করে আবেগ দেখাননি, কখনো অতিরিক্ত নাটকীয়তায় যাননি। তাঁর গাওয়া ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’, ‘তুমি রবে নীরবে’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ কিংবা ‘যদি তারে নাই চিনি গো’ প্রতিটি গানেই ছিল এক অপূর্ব সংযম ও গভীরতা।

শ্রোতার মনে হত, গানগুলো যেন সরাসরি হৃদয় থেকে উঠে আসছে, কোনো কৃত্রিমতা নেই।১৯৯৭ সালে ভারত সরকারের সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার পান রবীন্দ্রসংগীতে অবদানের জন্য। এছাড়া ‘টেগোর ফেলো’ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এই সম্মানগুলো তাঁর সংগীতজীবনের স্বীকৃতি হলেও, অর্ঘ্য সেন কখনো আলোর ঝলকানিতে মুগ্ধ হননি। তিনি ছিলেন নির্লিপ্ত, শান্ত, প্রায় সন্ন্যাসীর মতো।

সাক্ষাৎকারে খুব কমই দিতেন, মঞ্চে এসে গান গেয়ে চলে যেতেন। তাঁর গান শোনার পর শ্রোতারা প্রায়ই নিঃশব্দে চোখ মুছতেন কারণ সেই গানে কোথাও যেন রবীন্দ্রনাথ নিজে বেঁচে থাকতেন।তাঁর প্রস্থানে রবীন্দ্রসংগীতের জগতে একটা যুগের অবসান ঘটল। যে যুগে শিল্পীদের মধ্যে ছিল গভীরতা, সংযম আর রবীন্দ্রনাথের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

আজকের প্রজন্ম যারা তাঁর রেকর্ডিং শুনবে, তারা বুঝবে কেন অর্ঘ্য সেনকে বলা হতো ‘রবীন্দ্রসংগীতের আত্মা’। তাঁর গলায় যে সুর বেজেছে, সেই সুর কখনো থামবে না।আজ যখন তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যাবে না সরাসরি মঞ্চে, তখনও অসংখ্য রেকর্ড, ক্যাসেট, সিডি আর ডিজিটাল মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন। বাঙালির হৃদয়ে যতদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন, ততদিন অর্ঘ্য সেনও থাকবেন নীরবে, গভীরভাবে, চিরকালের মতো।

Sudipta Biswas

Sudipta Biswas is a senior correspondent at Kolkata24x7, covering national affairs, politics and breaking news.

Follow on Google