বর্ধমান আয়ুষ মেলায় বঙ্গীয় আয়ুর্বেদের গৌরবময় ইতিহাসের উন্মোচন

রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের উদ্যোগে ও ন্যাশানাল আয়ুষ মিশনের সহযোগিতায় রাজ্যজুড়ে আয়ুষ চিকিৎসাপদ্ধতির (Ayurveda) প্রসার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত জেলা ভিত্তিক আয়ুষ…

bengali-ayurveda-heritage-exhibition-purba-bardhaman-ayush-mela

রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের উদ্যোগে ও ন্যাশানাল আয়ুষ মিশনের সহযোগিতায় রাজ্যজুড়ে আয়ুষ চিকিৎসাপদ্ধতির (Ayurveda) প্রসার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত জেলা ভিত্তিক আয়ুষ মেলাগুলির মধ্যে এ বছর পূর্ব বর্ধমান আয়ুষ মেলায় এক ব্যতিক্রমী সংযোজন নজর কেড়েছে সকলের ঐতিহাসিক প্রদর্শনী ‘বঙ্গীয় আয়ুর্বেদের সংগ্রহশালা’।

Advertisements

তিনদিনব্যাপী এই মেলায় সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে আয়ুষ চিকিৎসা পরিষেবা, ভেষজ উদ্ভিদ বিতরণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচির পাশাপাশি প্রথমবারের মতো একত্রে উপস্থাপিত হয়েছে অবিভক্ত বাংলার আয়ুর্বেদের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, চিকিৎসা ঐতিহ্য ও দুষ্প্রাপ্য নথিপত্র।

   

আয়ুর্বেদের পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত অবিভক্ত বাংলার খ্যাতনামা আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের জীবন, সাধনা ও অবদানের বিস্তৃত ইতিহাস এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে রাজ্যের বর্তমান সরকারি আয়ুর্বেদ কলেজগুলির প্রতিষ্ঠালগ্নে যাঁদের অবদান ছিল, তাঁদের কর্মজীবন ও ঐতিহাসিক দলিল এখানে স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে ১৯২৪ সালে ঢাকার বিশুদ্ধ আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। এছাড়াও প্রদর্শিত হচ্ছে কবিরাজ যামিনী ভূষনের অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ বিদ্যালয় ও আয়ুর্বেদ আরোগ্যশালা সংক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রীমতী পদ্মজা নাইডুর চিঠি এবং ১৯৬৪ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের স্বাক্ষরিত আয়ুর্বেদ কলেজ অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সরকারি পত্র।

এই সংগ্রহশালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শতাব্দী প্রাচীন একাধিক আয়ুর্বেদ স্বাস্থ্য পত্রিকার সংরক্ষিত সংখ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে আয়ুর্বেদ বিদ্যালয় ও হাসপাতাল হস্তান্তর সংক্রান্ত স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রের বিরল নথি।

bengali-ayurveda-heritage-exhibition-purba-bardhaman-ayush-mela

আয়ুর্বেদ পুঁথি গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রদর্শনীটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত গঙ্গাধর কবিরাজের চরক সংহিতা র টিকা “জল্পকল্পতরু”, কুমোরটুলির বিশিষ্ট চিকিৎসক ও ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের ব্যক্তিগত চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেন, কোচবিহার রাজবাড়ির রাজবৈদ্য বিরজাচরণ গুপ্ত, রাজবৈদ্য প্রভাকর চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের কাজের পাশাপাশি বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলির চুপি গ্রামের কবিরাজ শিরোমণি শ্যামাদাস বাচস্পতির প্রতিষ্ঠিত “বৈদ্যশাস্ত্রপীঠ” কলেজের তৎকালীন নকশাও প্রদর্শিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওই কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সংক্রান্ত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে লেখা একটি চিঠিও প্রদর্শনীর অংশ।

এই ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন মালদা জেলার ডাঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ডাঃ সুমিত সুর বাংলার দুই তরুণ আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। তাঁদের এই প্রচেষ্টায় অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদের পাণ্ডুলিপি বিভাগের প্রধান ও বিশিষ্ট পুঁথি গবেষক অধ্যাপক অসিত কুমার পাঁজা।

এই মেলার প্রধান উদ্যোক্তা তথা পূর্ব বর্ধমান জেলার ডিস্ট্রিক্ট মেডিক্যাল অফিসার (আয়ুষ) ডাঃ ইন্দ্রনীল মাজী জানান, বর্ধমান জেলা দীর্ঘদিন ধরেই আয়ুর্বেদ চিকিৎসার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র “আরোগ্য নিকেতন” এই জেলার জীবন মশাইয়ের নাড়ি চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদের সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমন্বয়কে তুলে ধরেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “বঙ্গীয় আয়ুর্বেদের সংগ্রহশালা” নামের এমন প্রদর্শনী এর আগে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সারা ভারতবর্ষেও কোথাও হয়তো অনুষ্ঠিত হয়নি।

ডাঃ সুমিত সুর জানান যে বঙ্গ আয়ুর্বেদের সমগ্র ঐতিহ্যকে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা এবং রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। তিনি এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে আন্তরিক আবেদন জানান, যাতে এক সদর্থক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

Advertisements