ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL 2025) ২০২৫-এর একটি রোমাঞ্চকর ম্যাচে গুজরাট টাইটান্স (Gujarat Titans) রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে (RCB) ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে। বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে বুধবার অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে জিটি বোলিং এবং ব্যাটিংয়ে দুর্দান্ত সমন্বয় দেখিয়ে আরসিবির ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচটিকে বিবর্ণ করে দিয়েছে। ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জিটি ১৭.৫ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়, যেখানে ১৩ বল বাকি ছিল। জস বাটলারের অপরাজিত ৭৩ এবং মোহাম্মদ সিরাজের আগুনঝরা বোলিং এই জয়ের পিছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
ম্যাচের শুরু: সিরাজের আঘাতে আরসিবির ধাক্কা
ম্যাচের শুরু থেকেই গুজরাট টাইটান্স আধিপত্য বিস্তার করে। টস জিতে গুজরাটের অধিনায়ক শুভমান গিল প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন, এবং তাদের বোলাররা এই সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করেন। মোহাম্মদ সিরাজ, যিনি একসময় আরসিবির জার্সিতে মাঠ মাতিয়েছেন, এই ম্যাচে তার পুরনো দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখান। পাওয়ারপ্লের মধ্যে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে আরসিবির শীর্ষস্থানীয় ব্যাটারদের চাপে ফেলে দেন। প্রথমে তিনি দ্রুতগতির একটি ডেলিভারিতে দেবদত্ত পড়িক্কলকে (৪) বোল্ড করেন। এরপর ফিল সল্ট (১৪) তার শিকার হন, যিনি একটি বড় শট খেলতে গিয়ে স্টাম্প হারান।
সিরাজের পাশাপাশি গুজরাটের অন্যান্য বোলাররাও চাপ ধরে রাখেন। আরশদীপ সিং বিরাট কোহলিকে (৭) আউট করে আরসিবির ব্যাটিং লাইনআপে আরও ধাক্কা দেন। কোহলি একটি শর্ট বলে পুল শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। পাওয়ারপ্লের শেষে আরসিবি ৪২/৪-এ নেমে যায়, যা তাদের জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করে। সিরাজ তার ৪ ওভারে মাত্র ১৯ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন, যার মধ্যে লিয়াম লিভিংস্টোনের (৫৪) উইকেটও ছিল। তার এই পারফরম্যান্স তাকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দেয়।
আরসিবির প্রত্যাবর্তন: লিভিংস্টোনের প্রতিরোধ
শুরুতে বড় ধাক্কা খাওয়া সত্ত্বেও আরসিবি মিডল অর্ডারে লিয়াম লিভিংস্টোনের ৪০ বলে ৫৪ রানের ইনিংসের সৌজন্যে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। তিনি রশিদ খানের এক ওভারে তিনটি ছক্কা মেরে দলকে লড়াইয়ে ফেরান। জিতেশ শর্মা (৩৩) এবং টিম ডেভিড (৩২) তাকে ভালো সঙ্গ দেন। ডেভিড শেষ ওভারে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের বিরুদ্ধে ১৬ রান তুলে দলকে ১৬৯/৮-এ পৌঁছে দেন, যদিও শেষ বলে তিনি আউট হন। রশিদ খান ২২ রানে ২ উইকেট নিয়ে গুজরাটের বোলিংয়ে অবদান রাখেন। তবে, গুজরাটের ফিল্ডিংয়ে কিছু ভুলের কারণে আরসিবি এই স্কোরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা পরে ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারত।
গুজরাটের তাড়া: বাটলারের আগ্রাসী ব্যাটিং
১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে গুজরাট টাইটান্স শুরুতে সতর্কতার সঙ্গে এগোয়। শুভমান গিল (১৯) এবং সাই সুদর্শন শুরুটা করেন, তবে পঞ্চম ওভারে ভুবনেশ্বর কুমার গিলকে আউট করেন। এরপর জস বাটলার এবং সাই সুদর্শন দ্বিতীয় উইকেটে ৭৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন। সুদর্শন ৩৬ বলে ৪৯ রান করে জশ হ্যাজলউডের বলে আউট হন, তবে ততক্ষণে গুজরাট জয়ের পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।
জস বাটলার তার অপরাজিত ৩৯ বলে ৭৩ রানের ইনিংসে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। তিনি রাসিখ সালামের এক ওভারে ১৮ রান (দুটি ছক্কা ও একটি চার) এবং ক্রুনাল পাণ্ড্যের ওভারে ১৭ রান তুলে গতি বাড়ান। তার ইনিংসে ৬টি চার এবং ৪টি ছক্কা ছিল, যা আরসিবি বোলারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। শেষ দিকে শেরফেন রাদারফোর্ড ১৮ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থেকে ১৭.৫ ওভারে জয় নিশ্চিত করেন। রাদারফোর্ড শেষ বলে একটি ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করেন। আরসিবির বোলাররা মিডল ওভারে চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, এবং হ্যাজলউড ছাড়া কেউই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেননি।
ম্যাচের পর্যালোচনা
গুজরাট টাইটান্সের এই জয় তাদের তিন ম্যাচে দ্বিতীয় জয় এনে দিয়েছে, যা তাদের পয়েন্ট টেবিলে শক্তিশালী অবস্থানে রাখে। মোহাম্মদ সিরাজ তার পুরনো দলের বিরুদ্ধে আবেগপ্রবণ হলেও বল হাতে নিয়ে দারুণ প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি ম্যাচের পর বলেন, “আরসিবির বিরুদ্ধে খেলতে একটু চাপে ছিলাম, কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল দলের জন্য ভালো করা।” জস বাটলার তার ইনিংস নিয়ে বলেন, “বোলাররা আমাদের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছে, আর আমি শুধু সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছি।”
অন্যদিকে, আরসিবির জন্য এই হার তাদের মৌসুমের প্রথম ধাক্কা। অধিনায়ক রজত পাটীদার বলেন, “আমরা ১৮৫-১৯০ রানের লক্ষ্য রেখেছিলাম, কিন্তু শুরুতে উইকেট হারানো আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। তবে লিভিংস্টোন এবং ডেভিডের লড়াই আমাদের আশা দিয়েছে।” তিনি বোলারদের প্রশংসা করলেও মিডল ওভারে উইকেট না পাওয়াকে হারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
বেঙ্গালুরুর সমর্থকরা এই হারে হতাশ হলেও দলের প্রতি তাদের সমর্থন অটুট। স্টেডিয়ামে উপস্থিত একজন সমর্থক বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম ঘরের মাঠে জয় দিয়ে শুরু হবে, কিন্তু গুজরাটের খেলা আমাদের ছাপিয়ে গেছে।” অন্যদিকে, গুজরাটের সমর্থকরা বাটলার এবং সিরাজের প্রশংসায় মুখর।
এই ম্যাচে গুজরাট টাইটান্স তাদের সর্বাত্মক দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। মোহাম্মদ সিরাজের প্রাক্তন দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত বোলিং এবং জস বাটলারের আগ্রাসী ব্যাটিং আরসিবির ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচটিকে ম্লান করে দিয়েছে। আরসিবির জন্য এই হার একটি শিক্ষা, এবং তারা পরবর্তী ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। আইপিএল ২০২৫-এর এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় গুজরাট এখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, আর সমর্থকরা আরও উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের অপেক্ষায় রয়েছে।