বিট্টু দত্ত, কলকাতা: বাংলার ফুটবল একসময় দেশের গর্ব ছিল। কলকাতার মাঠে হাজার হাজার দর্শকের আবেগ, বড় ক্লাবগুলোর ঐতিহ্য এবং একের পর এক প্রতিভাবান ফুটবলারের উত্থান বাংলাকে দেশের ফুটবলের অন্যতম কেন্দ্র করে তুলেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধার কিছুটা কমেছে। তবুও আশার আলো দেখছেন কোচ রঞ্জন ভট্টাচার্য। ট্রাইবাল খেলো ইন্ডিয়া ফুটবল গেমসে পশ্চিমবঙ্গকে চ্যাম্পিয়ন করানো এই কোচ মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও তৃণমূল স্তরে কাজ হলে বাংলা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বাংলার ফুটবলের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন আমাদের প্রতিনিধি।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে বাংলার ফুটবলকে কীভাবে দেখছেন?
রঞ্জন ভট্টাচার্য: বাংলার ফুটবলের ঐতিহ্য আজও আছে। মানুষের আবেগও কমেনি। তবে আগের মতো ধারাবাহিক সাফল্য নেই। প্রতিভা এখনও উঠে আসছে, কিন্তু সেই প্রতিভাকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার কাজ আরও ভালোভাবে করতে হবে। আগে পাড়ায় পাড়ায়, মাঠে মাঠে ফুটবল হতো। এখন সেই পরিবেশ কিছুটা বদলেছে। তবুও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ আমাকে আশাবাদী করে।
প্রশ্ন: বাংলা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ কী?
রঞ্জন: আমার মতে, তৃণমূল স্তরে পরিকল্পনার অভাব বড় কারণ। ছোটবেলা থেকেই ভালো কোচিং, ফিটনেস, পুষ্টি আর নিয়মিত ম্যাচ দরকার। অনেক ছেলে-মেয়ে আছে, যাদের প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। শুধু বড় ক্লাবের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।
প্রশ্ন: ট্রাইবাল খেলো ইন্ডিয়া গেমসে পশ্চিমবঙ্গকে চ্যাম্পিয়ন করানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
রঞ্জন: দারুণ অভিজ্ঞতা। ওই দলের অনেকেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছিল। সুযোগ-সুবিধা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু ওদের জেদ আর লড়াই করার মানসিকতা অসাধারণ। আমরা মানসিক প্রস্তুতির ওপরও জোর দিয়েছিলাম। ওদের সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে বাংলার প্রতিভা অনেক দূর যেতে পারে।
প্রশ্ন: গ্রামবাংলা ও ট্রাইবাল এলাকার ফুটবলারদের সম্ভাবনা কতটা?
রঞ্জন: আমি বরাবরই বলি, বাংলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই গ্রাম আর ট্রাইবাল এলাকার ছেলেমেয়েদের হাতে। ওদের মধ্যে স্বাভাবিক শক্তি, গতি, স্ট্যামিনা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, লড়াই করার মানসিকতা থাকে। শুধু ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ আর সুযোগ দরকার।
প্রশ্ন: বড় ক্লাবগুলোর ভূমিকা কতটা জরুরি?
রঞ্জন: খুবই জরুরি। East Bengal FC, Mohun Bagan Super Giant, Mohammedan Sporting Club—এই ক্লাবগুলোর ঐতিহ্য আছে, সমর্থন আছে। যদি ওরা যুব উন্নয়ন, একাডেমি, জেলা থেকে প্রতিভা খোঁজার কাজে আরও জোর দেয়, তাহলে বাংলা অনেক লাভবান হবে।
প্রশ্ন: বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে কী বদল দেখছেন?
রঞ্জন: এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন। তারা ফিটনেস, ডায়েট, ভিডিও দেখে শেখা—এসব বিষয়ে আগ্রহী। এটা ভালো দিক। তবে অনেকেই খুব তাড়াতাড়ি সাফল্য চায়। ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করতে হবে।
প্রশ্ন: বাংলার ফুটবলকে আবার উপরে তুলতে কী করা দরকার?
রঞ্জন: স্কুল ও জেলা স্তরে বেশি প্রতিযোগিতা দরকার। প্রত্যন্ত এলাকায় কোচিং ক্যাম্প করতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি আনতে হবে। প্রতিভাবানদের চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ফুটবলারদের মানসিকভাবে শক্ত হতে হবে।
প্রশ্ন: ট্রাইবাল খেলো ইন্ডিয়া গেমসের কোনও মজার স্মৃতি আছে?
রঞ্জন: আছে অবশ্যই। একদিন অনুশীলনে আমাদের অধিনায়ক অমিত বল নিয়ে খুব জোরে দৌড়তে গিয়ে নিজের পায়েই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। সবাই প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, পরে ও নিজেই উঠে হেসে দেয়। তারপর সবাই হেসে গড়াগড়ি। আর সেমিফাইনালের আগে চাকু মান্ডি আমার নকল করে বক্তৃতা দিতে শুরু করেছিল। ড্রেসিংরুমের চাপ একেবারে কেটে গিয়েছিল।
প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার আশা কী?
রঞ্জন: আমি খুব আশাবাদী। বাংলার ফুটবলের মাটি এখনও উর্বর। প্রতিভা আছে, আগ্রহ আছে। যদি প্রশাসন, ক্লাব আর কোচেরা একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা আবার দেশের ফুটবলে শক্ত জায়গায় ফিরবে।
রঞ্জন ভট্টাচার্যের কথায় স্পষ্ট, বাংলার ফুটবল এখনও শেষ হয়ে যায়নি—বরং নতুন করে জেগে ওঠার অপেক্ষায় আছে। মাঠের ঘাসে এখনও স্বপ্ন জন্মায়, জেলার মাটিতে এখনও প্রতিভা বেড়ে ওঠে। দরকার শুধু সঠিক দিশা, যত্ন আর সুযোগ। অতীতের গৌরব নিয়ে গর্ব করাই যথেষ্ট নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বও নিতে হবে। বড় ক্লাব, প্রশাসন, কোচ এবং ফুটবলার সবাই একসঙ্গে এগোলে বাংলা আবার দেশের ফুটবলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। আবেগ তো আছেই, এবার সেই আবেগকে কাজে বদলানোর সময় এসেছে।




















