“রাম বাংলার নয়, বহিরাগত”—এমন দাবি যখন কেউ কেউ তুলছেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম নিজের ইতিহাস আর ঐতিহ্য দিয়ে সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। এ যেন শ্যাম বেনেগালের সিনেমার ‘ওয়েলকাম টু সজ্জনপুর’। গ্রামের প্রতিটি মানুষের নামের শুরুতেই রাম—রামরতন, রামচরণ, রামসেবক, রামময়, রামঅর্জুন। এটা কোনও গোবলয়ের গ্রাম নয়, এটা বাঁকুড়া শহরের কাছেই সানবাঁধের রামপাড়া (Rampara)। গ্রামের নাম থেকে শুরু করে বাসিন্দাদের নাম—সবেতেই রামের ছোঁয়া। স্থানীয়দের দাবি, এই রীতি গ্রামে প্রায় আড়াইশো বছর ধরে চলে আসছে।
২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন হয়েছিল। সারা দেশের সঙ্গে রামপাড়াও আবেগে ভেসে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষের কাছে রাম শুধু একটি নাম নয়, তিনি তাদের কুলদেবতা, তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্র। গ্রামে রয়েছে একটি রাম মন্দির, যেখানে প্রতিদিন তিন বেলা রঘুবরের পুজো হয়। সকালে রামের মূর্তির পাশাপাশি শালগ্রাম শিলাকে স্নান করিয়ে আহ্নিক করানো হয়, তারপর দেওয়া হয় শীতল ভোগ। দুপুরে অন্নভোগ দেওয়া হয়, আর রাতে আরেকবার আহ্নিকের পর প্রভু রামকে শুইয়ে দেওয়া হয়। এভাবে বাংলার এই গ্রামে গত ২৫০ বছর ধরে রামের পুজো চলছে, নিয়মিত এবং অটুট ভক্তি নিয়ে।
রামপাড়ার (Rampara) ঐতিহ্য: নামে ও সংস্কৃতিতে রাম
রামপাড়ার বাসিন্দারা বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরা এই গ্রামে বসতি স্থাপনের সময় থেকেই রামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। গ্রামের নামকরণ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নামে রামের উপস্থিতি এই ভক্তিরই প্রতিফলন। গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা রামসেবক মণ্ডল বলেন, “আমাদের বাবা-ঠাকুর্দার আমল থেকে এই রীতি চলে আসছে। আমরা রামের নামে জীবন শুরু করি, রামের নামেই দিন শেষ করি।” তিনি আরও জানান, গ্রামে কোনও শিশুর জন্ম হলে তার নামের সঙ্গে রাম যোগ করার প্রথা এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
গ্রামের রাম মন্দিরটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি গ্রামবাসীদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরে প্রতিদিন সকাল-দুপুর-রাত তিন বেলা পুজোর আয়োজন হয়। স্থানীয় পুরোহিত রামময় দাস জানান, “এখানে রামকে আমরা শুধু দেবতা হিসেবে দেখি না, তিনি আমাদের পরিবারের একজন। তাই তাঁর সেবায় কোনও ত্রুটি রাখি না।” পুজোর এই নিয়মিত আচার গ্রামের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
অযোধ্যার রাম মন্দির উদ্বোধন: রামপাড়ার উৎসব
২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি যখন অযোধ্যায় রাম মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, তখন রামপাড়ায় উৎসবের আমেজ ছিল দেখার মতো। গ্রামের মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সবাই এই উৎসবে শামিল হয়েছিল। গ্রামের মহিলারা মন্দিরে দিয়ে এসেছিলেন হরেক রকম ভোগ, আর পুরুষরা সন্ধ্যায় কীর্তনের আসর বসিয়েছিলেন। রামচরণ মণ্ডল নামে এক গ্রামবাসী বলেন, “অযোধ্যায় রামলালার মন্দির হওয়ায় আমরা গর্বিত। আমাদের গ্রামে তো রাম সবসময়ই আছেন, তবে এই দিনটা আমাদের কাছে বিশেষ ছিল।”
বাংলার গ্রামে রামের উপস্থিতি: একটি প্রশ্নের জবাব
রামকে নিয়ে যখন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিতর্ক উঠছে, তখন রামপাড়ার মতো গ্রামগুলি নীরবে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে রাম বাংলার কাছে কতটা আপন। এখানে রাম কোনও বহিরাগত নন, তিনি গ্রামের জীবনের একটি অংশ। গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, “আমাদের কাছে রাম মানে ভক্তি, রাম মানে ঐতিহ্য। এটা আমাদের রক্তে মিশে আছে।”
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় রামায়ণের প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে রয়েছে। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণ বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রামপাড়ার মতো গ্রামগুলি এই ঐতিহ্যের জীবন্ত উদাহরণ। গ্রামের প্রবীণরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা সম্ভবত রামের প্রতি ভক্তি থেকেই এই রীতি শুরু করেছিলেন, যা আজও অটুট রয়েছে।
রামপাড়ার বার্তা
রামপাড়া শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি একটি জীবন্ত সাক্ষ্য—যে বাংলার মাটিতে রামের গভীর শিকড় রয়েছে। এখানে রামের পুজো, নামকরণ, আর দৈনন্দিন জীবনে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি এখানকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন কেউ প্রশ্ন তোলেন, “রাম কি বাংলার?” তখন রামপাড়ার মতো গ্রামগুলি নিজেদের উদাহরণ দিয়ে বলে ওঠে—হ্যাঁ, রাম এখানেই আছেন, বাংলার গ্রামের মাটিতে, মানুষের হৃদয়ে।