Durga Puja: স্বামীজী পুজোর চার-পাঁচদিন আগে বেলুড়ে দুর্গোৎসবের সিদ্ধান্তে নেন

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো (Durga Puja) করলেন। আর সেই থেকেই বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর প্রচলন হল। কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই পুজো? বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার ...

By Rana Das

Published:

Updated:

Follow Us
belur math by swamiji

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো (Durga Puja) করলেন। আর সেই থেকেই বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর প্রচলন হল। কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই পুজো?

বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের মনে ইচ্ছে ছিল যে তিনি বেলুড়মঠে দুর্গাপুজো করবেন। কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে উঠছিল না। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে বেলুড়মঠ প্রতিষ্ঠার পর স্বামীজী প্রায়ই তাঁর প্রিয় বেলগাছতলায় বসে সম্মুখে প্রবাহিতা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আপন মনে গাইতেন, “বিল্ববৃক্ষমুলে পাতিয়া বোধন/গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন।/ঘরে আনব চণ্ডী, কর্ণে শুনব চণ্ডী,/আসবে কত দণ্ডী, জটাজুটধারী।…”

   

১৯০১ সালের মে-জুন মাস। স্বামীজির অন্যতম গৃহী শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী বেলুড়মঠে এলে বিবেকানন্দ তাঁকে ডেকে রঘুনন্দনের ‘অষ্টবিংশতি তত্ত্ব’ বইটি কিনে আনার জন্য বললেন। শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি রঘুনন্দনের বইটি নিয়ে কি করবেন?’ স্বামীজি বলেছিলেন, ‘এবার মঠে দুর্গোৎসব করবার ইচ্ছে হচ্ছে। যদি খরচ সঙ্কুলান হয় ত মহামায়ার পুজো করব। তাই দুর্গোৎসব বিধি পড়বার ইচ্ছা হয়েছে। তুই আগামী রবিবার যখন আসবি তখন ঐ পুস্তকখানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসবি।’ যথাসময়েই শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী বইখানি বিবেকানন্দকে এনে দিয়েছিলেন। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বইটি পড়া শেষ করে বিবেকানন্দ তাঁর স্নেহভাজন শিষ্যের সঙ্গে আবার দেখা হতেই জানিয়েছিলেন, ‘রঘুনন্দনের স্মৃতি বইখানি সব পড়ে ফেলেছি, যদি পারি তো এবার মার পূজা করব।’

এরপর দীর্ঘদিন কেটে যায়। পুজোর সময়ও এসে যায়। কিন্তু পুজোর এক সপ্তাহ আগেও এ নিয়ে কোনও কথাবার্তা বা উদ্যোগ দেখা গেল না। হয়ত এ বারও বিবেকানন্দের ইচ্ছাটির পূরণ হল না। কিন্তু হঠাৎই একদিন, তখন পুজোর আর মাত্র চার-পাঁচ দিন বাকি, স্বামীজি কলকাতা থেকে নৌকা করে বেলুড়মঠে ফিরেই ‘রাজা কোথায়? রাজা কোথায়?’ বলে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজের খোঁজ করতে লাগলেন। (স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামী বিবেকানন্দ রাজা বলে সম্বোধন করতেন)। স্বামী ব্রহ্মানন্দকে দেখতে পেয়েই বিবেকানন্দ বলে উঠলেন, ‘এবার মঠে প্রতিমা এনে দুর্গাপূজা করতে হবে, তুমি সব আয়োজন করে ফেলো।’ সবে আর মাত্র চার-পাঁচটা দিন বাকি রয়েছে। এত কম সময়ের মধ্যে সব আয়োজন কীভাবে করবেন, প্রতিমাই বা পাওয়া যাবে কি না, এই সব ভেবে ব্রহ্মানন্দজী স্বামীজির কাছে দুটো দিন সময় চাইলেন। স্বামীজি বললেন, ‘আমি ভাব-চক্ষে দেখেছি এবার মঠে দুর্গোৎসব হচ্ছে এবং প্রতিমায় মার পূজা হচ্ছে।’

তখন স্বামী ব্রহ্মানন্দজীও তাঁর এক অদ্ভুত দর্শনের কথা স্বামী বিবেকানন্দকে জানালেন। দিন চারেক আগের ঘটনা। ব্রহ্মানন্দজী বেলুড়মঠের গঙ্গাতীরে বসেছিলেন। হঠাৎই দেখলেন দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে মা দুর্গা গঙ্গা পার হয়ে মঠের বেলগাছতলায় এসে উঠলেন।

স্বামীজি আর ব্রহ্মানন্দ মহারাজের মধ্যেকার এই সব কথাবার্তা বেলুড়মঠের অন্যান্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পরতেই বেশ হই হই পড়ে গেল। ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ব্রহ্মাচারী কৃষ্ণলালকে কলকাতার কুমারটুলিতে পাঠালেন কোনও প্রতিমা পাওয়া যাবে কি না দেখে আসতে। আর কী আশ্চর্য! ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল কুমারটুলিতে গিয়ে দেখলেন যে মাত্র একটিই সুন্দর প্রতিমা সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে। যিনি বা যাঁরা সেই প্রতিমাটি তৈরি করতে দিয়েছিলেন, সে দিনও পর্যন্ত তাঁরা সেটি নিতে আসেননি। ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল শিল্পীকে ওই প্রতিমাটি পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞাসা করতে শিল্পী একটি দিন দেখে নেওয়ার সময় চাইলেন। বেলুড়মঠে ফিরে এসে এই খবর স্বামী বিবেকানন্দকে জানাতেই তিনি ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলালকে বললেন, ‘যেমন করেই হোক তুমি প্রতিমাখানি নিয়ে আসবে।’

পরের দিন স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল ও স্বামী প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীর দেবীর কাছে গেলেন বেলুড়মঠে দুর্গাপুজো করার অনুমতি চাইতে। শ্রীশ্রীমা সানন্দে অনুমতি দিলেন, শুধু পশুবলি দিতে নিষেধ করলেন। ইতিমধ্যে স্বামী প্রেমানন্দ কুমারটুলিতে সেই প্রতিমা শিল্পীর কাছে গিয়ে দেখলেন প্রতিমাটি সে দিনও কেউ নিতে আসেনি। তিনি প্রতিমা শিল্পীর সঙ্গে সমস্ত কথাবার্তা ঠিক করে প্রতিমাটি বায়না করে এলেন। অন্যদিকে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ পুজোর সমস্ত আয়োজন করে ফেললেন।

সেবার দুর্গাপুজোর তিথি পড়েছিল কার্তিক মাসে। ১লা কার্তিক, শুক্রবার (১৮ই অক্টোবর) ছিল ষষ্ঠী। তার আগের দিন অর্থাৎ পঞ্চমীর দিন ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল, স্বামী নির্ভয়ানন্দ এবং আরও কয়েক জন সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারী মিলে কুমারটুলি থেকে নৌকা করে দুর্গা প্রতিমাখানি মঠে নিয়ে এলেন। মঠের উত্তর দিকের জমিতে দুর্গাপুজোর এক বিরাট মণ্ডপ বানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিমাখানি সেখানে না নিয়ে গিয়ে ঠাকুর ঘরের নীচতলার দালানে রাখা হল। এর কিছুক্ষণ বাদেই আকাশ ভেঙে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। তবে তাতে প্রতিমা বা মণ্ডপের কোনও ক্ষতি হয়নি।

ষষ্ঠীর দিন সকালে বাগবাজার থেকে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণী তাঁর অন্যান্য ভক্তদের নিয়ে বেলুড়মঠে চলে এলেন। তাঁর থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। বলা হয় যে সন্ন্যাসীদের কোনও পুজো বা বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডে অধিকার নেই। কেননা তাঁরা সর্বত্যাগী। তাই শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীর নামেই পুজোর সংকল্প করা হয়েছিল। আজও বেলুড়মঠের পুজোয় শ্রীশ্রীমায়ের নামেই সংকল্পের প্রথা অব্যাহত রয়েছে। স্বামীজির প্রিয় বেলগাছতলাতে বোধন অনুষ্ঠান হল। এরপর ঠাকুর দালান থেকে প্রতিমাকে মণ্ডপে এনে স্থাপন করা হল। যেন মহোৎসব শুরু হল। অধিবাস, ষষ্ঠীর পুজো ইত্যাদি। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীর অনুমতি নিয়ে পুজো করতে বসলেন ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল। সঙ্গে তন্ত্রধারকরূপে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্য।

২রা কার্তিক (১৯ অক্টোবর) শনিবার ছিল সপ্তমীপুজো। স্বামী বিবেকানন্দ ওই দিন যেন ছিলেন পূর্ণ আনন্দে উজ্জীবিত। কখনও এ দিক ও দিক পায়চারি করে সবকিছু তদারকি করছেন, কখনও বা মণ্ডপে বসে সকলের সঙ্গে হাসি গল্পে মেতেছেন। কিন্তু ৩ কার্তিক (২০ অক্টোবর) রবিবার মহাষ্টমীর দিন তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেদিন আর মণ্ডপেই আসতে পারলেন না। দোতলায় নিজের ঘরে ভীষণ জ্বরে শস্যাশায়ী থাকলেন। তবে ৪ঠা কার্তিক (২১শে অক্টোবর) সোমবার ভোরবেলা সন্ধিপুজোর সময় স্বামীজী মণ্ডপে এসে বসলেন। শ্রীশ্রীদুর্গামায়ের পাদপদ্মে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করলেন।

এরপর কয়েকজন কুমারীর পুজো হল, স্বামীজীর অনুরোধে গৌরী মা (শ্রী রামকৃষ্ণদেবের মন্ত্র শিষ্যা ও একমাএ সন্ন্যাসিনী শিষ্যা, প্রথম নারী মঠ শ্রী শ্রী সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাএী ) কুমারী পূজার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাদ্য- অর্ঘ- শঙ্খবলয় – বস্ত্রাদি দিয়ে স্বামীজী নয়জন কুমারীকে পূজা করেন । স্বামীজী সেই সকল কুমারীদিগকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করেন। ভাবাবস্থায় একজন কুমারীকে ( শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীর মন্ত্র শিষ্যা ও একমাএ সন্ন্যাসিনী শিষ্যা, সারদেশ্বরী আশ্রমের দ্বিতীয় অধ্যক্ষা দূর্গা পুরী দেবী ) কপালে রক্তচন্দন পড়াবার সময় স্বামীজী শিহরিয়ে উঠে বলেছিলেন- “আহা দেবীর তৃতীয় নয়নে আঘাত লাগে নি তো।” উক্ত কুমারীদের মধ্যে রামলাল দাদার কনিষ্ঠা কন্যা রাধারানীও অন্যতমা ছিলনে । শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং এই দিন রামলাল দাদার জ্যেষ্ঠা কন্যা কৃষ্ণময়ীদিদিকেএবং আরও কয়েকজন সধবাকেও ‘এয়োরানী পূজা’ করেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ওই দিনই মহানবমীর সন্ধ্যায় আরতির পর স্বামীজী একের পর এক ভজন গাইলেন।

৫ই কার্তিক (২২শে অক্টোবর) মঙ্গলবার ছিল বিজয়া দশমী। পুজোর অন্যান্য দিনগুলির মতো বিকেল বেলা প্রতিমা নিরঞ্জন দেখতেও অসংখ্য মানুষের ভিড় হয়েছিল। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণী দুর্গাপ্রতিমা বরণ করলেন, বরণের সময় শ্রীশ্রীমায়ের দুচোখ বেয়ে জলের ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। তিনি বরণ শেষে ঘরের মেয়ে উমা কে চিবুক ধরে চুমো খেয়ে বিদায় জানলেন এবং পরের বছর পুনরায় আসার কথাও তাঁর কানে কানে বলে দিলেন। এরপর ঢাক-ঢোলের বাজনার সঙ্গে সঙ্গে ভক্ত, ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসীগণ সবাই মিলে “মহামাঈ কী জয়”, “দুর্গা মাঈ কী জয়” ধ্বনি দিতে দিতে প্রতিমাকে নৌকায় ওঠালেন। কেউ কেউ তখন বাজানার তালে তালে নাচছিলেন। এমন সময় স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজও এসে নৌকায় উঠলেন। তারপর প্রতিমার সামনে ভাবে বিভোর হয়ে নৃত্য করতে লাগলেন। অসুস্থতার জন্য স্বামীজী দশমীর দিনও দোতলার ঘর থেকে নিচে নামেননি। কিন্তু স্বামী ব্রহ্মানন্দ নৌকায় নাচছেন শুনে আর থাকতে পারেননি।

গঙ্গার ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢাক,ঢোল, কাঁশির তালে তালে নৌকা এগিয়ে চলেছে প্রতিমা নিরঞ্জনের। মাঝে মাঝে সমবেত ধ্বনি উঠছে “দুর্গা মাঈ কী জয়” আর এসবের মাঝেই তুমুল ভাবে বিভোর হয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দজী নেচে চলেছেন। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে স্বামীজী এই দৃশ্য দেখতে লাগলেন। এইভাবেই বেলুড়মঠের প্রথম দুর্গোৎসবের সমাপন ঘটল। আজ স্বামীজির করা সেই দুর্গোৎসব এক মহীরুহে রূপান্তরিত হয়েছে। সারা পৃথিবী থেকে ভক্তেরা আসেন এই মহোৎসবে সামিল হতে। স্বামীজি বিশ্বকে জ্যান্ত দুর্গার পূজা দেখাতে চেয়েছিলেন তা তিনি করে দেখিয়েও ছিলেন। পরবর্তী কালে ব্রহ্মানন্দজী বলেছিলেন এই পূজা আমাদের শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীরই পূজা মৃণ্ময়ী প্রতিমায়। তিনি এবার সব অস্ত্র রেখে দুইহাত কোলে রেখে এসেছেন “অভয়া” রূপে। তিনিই আমাদের দুর্গোৎসবের প্রাণপ্রতিমা। 

তথ্যসূত্র : সারদা রামকৃষ্ণ , মঠে স্বামীজী দূর্গা পূজা।

Rana Das

Rana Das pioneered Bengali digital journalism by launching eKolkata24.com in 2013, which later transformed into Kolkata24x7. He leads the editorial team with vast experience from Bartaman Patrika, Ekdin, ABP Ananda, Uttarbanga Sambad, and Kolkata TV, ensuring every report upholds accuracy, fairness, and neutrality.

Follow on Google