অস্থির সময়ে দিলীপকুমারের ‘সাগিনা মাহাতো’ মুক্তি পেয়েছিল

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক অস্থির সময়ে এই ছবিটি হয়েছিল। অকগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়লেও তা ভেঙে যায়। নকশাল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। পাড়ায় পাড়ায় এলাকা দখল নিয়ে সিপিএম, নকশাল ও নব কংগ্রেসিদের মধ্যে নিত্য বোমা গুলি খুনোখুনি

196

নিউজ ডেস্ক: পাঁচ দশক আগে গৌর কিশোর ঘোষের ছোটগল্প নিয়ে ‘সাগিনা মাহাতো’ছবি করেছিলেন তপন সিংহ । আর আর সেই ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার৷ শ্রমিক আন্দোলনের নামে এক চক্রান্তের কাহিনি উঠে আসে ছবিতে৷

ওই গল্পের সময়কাল স্বাধীনতার ঠিক আগে ১৯৪৪-৪৫।কাহিনির পটভূমি কার্শিয়াঙে তিনধারিয়া এলাকায় রেল শ্রমিকদের কথা। কেমন ভাবে অত্যাচারিত হত দীনহীন এই মানুষগুলো৷ এই পরিস্থিতিতে অদ্ভূত চরিত্রের শ্রমিক সাগিনার উত্থান, সে ক্রমশ হয়ে ওঠে স্থানীয় শ্রমিকদের নেতা৷ কারণ সাগিনা চালু করে লাথিঝাঁটার খাওয়ার বদলা স্বরূপ উল্টে বাবুদের ধোলাই পিটাই।তখনই আবার কলকাতার বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন ওই স্থানীয় রেল শ্রমিকদের নিজেদের দখলে আনতে চাইল।মধ্যবিত্তদের হাতে শ্রমিক আন্দোলনের লাগাম রাখতে স্থানীয় উঠে আসা শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে এক চক্রান্তের কাহিনি এটি৷ তখন গোরা রেল কোম্পানির যোগসাজশে সাগিনাকে লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার করে দেওয়া হল। একই ভাবে পার্টির বড় নেতা বানিয়ে সাগিনাকে বোম্বাই, মাদ্রাজের শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার দেখতে পাঠান হল।সাগিনার উত্থানে শ্রমিকদের অধিকার যে ভাবে বাড়ছিল তাতে ভাটা পড়ল৷ এরফলে ফের শ্রমিকদের দুর্দশা বাড়ায় সাগিনার বিরুদ্ধে উল্টে শ্রমিকদের ক্ষোভ দানা বাধল৷ চক্রান্ত করেই ওই ভাবেই স্থানীয় শ্রমিকদের চোখের মণি সাগিনাকে শ্রমিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছিল।

সাগিনা মাহাতো গল্পটা ভাল লেগেছিল তপন সিংহের, ভেবে ছিলেন এই গল্প নিযে ছবি করবেন। অবশেষে প্রযোজক জুটল।পরিচালক চাইলেন সাগিনা চরিত্রের জন্য দিলীপকুমারকে। বলিউডের এই অভিনেতা আগে তপন সিংহকে জানিয়েছিলেন, বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে চান। সেই সময় দিলীপকুমার-সায়রাবানু মাদ্রাজে শুটিং এ ব্যস্ত। যোগাযোগ করা হল এবং তপন সিংহ পরিচালক শুনে দিলীপ আগ্রহ প্রকাশ করলেন ৷ এই বিষয়ে কথা বলার জন্য মাদ্রাজে আসতে বলেন তিনি।সেই সময় নাকি এক মজার ঘটনা ঘটেছিল৷ প্রযোজককে নিয়ে পরিচালক মাদ্রাজে গিয়ে জানাতে পারেন দিলীপকুমার সায়রাবানু বোম্বে চলে গেছেন৷ ফলে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন এবং ছবির প্রযোজক ও পরিচালক ঠিক করেন এই রকম স্বামী-স্ত্রী জুটি নিয়ে কাজ করবেন না৷ এমন কথা যখন ভাবছেন তারা তখন তাদের হোটেলের দরজার টোকা মারেন কেউ এবং দরজা খুলে দেখেন দিলীপকুমার হাজির৷

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক অস্থির সময়ে এই ছবিটি হয়েছিল। অকগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়লেও তা ভেঙে যায়। নকশাল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। পাড়ায় পাড়ায় এলাকা দখল নিয়ে সিপিএম, নকশাল ও নব কংগ্রেসিদের মধ্যে নিত্য বোমা গুলি খুনোখুনি। চলছে বাস-ট্রাম পোড়ানো। তার উপর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার বাংলায় শরণার্থীদের ভিড়। শুটিং চলাকালীনই নানা রকম রাজনৈতিক হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল তপন সিংহকে৷ তাছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের মুখোশ খুলে দেওয়ায় এই ছবির মুক্তি নিয়ে বাধা আসে। সেন্সর সার্টিফিকেট পেলেও ছবি রিলিজ না করতে দেওয়ার হুমকি আসে৷তখন শুধু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জন্য বিশেষ শো-এর ব্যবস্থা করা হয় এবং তারপর ছবি মুক্তি পায়৷ পাঁচ দশক আগে ১৯৭০ সালের ২১ অগস্ট মুক্তি পেয়েছিল ‘সাগিনা মাহাতো’। দিলীপকুমারের এই ছবি এত ভাল লেগেছিল যে তাঁর অনুরোধে হিন্দিতে রিমেক করা হয় ‘সাগিনা’নামে। সেটা অবশ্য ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায়৷ বাংলা‘সাগিনা মাহাতো’ হিট হলেও হিন্দি ‘সাগিনা’অবশ্য চলেনি। কারণ সম্ভবত কলকাতার মানুষের কাছে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও বম্বেতে সেটা ততটা ছিল না।