বিট্টু দত্ত, কলকাতা: বাংলার ফুটবল থেকে ভারতীয় দলের জার্সি, নিজের পরিশ্রম, লড়াই এবং ধারাবাহিকতার জোরে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন মোহাম্মদ রফিক। টালিগঞ্জ অগ্রগামী থেকে শুরু করে প্রয়াগ ইউনাইটেড, ইস্টবেঙ্গল, কলকাতার বড় মঞ্চ এবং জাতীয় দল, তাঁর সফর অনুপ্রেরণার। সেই যাত্রাপথ নিয়েই রইল বর্তমানে ইউনাইটেড স্পোর্টসের ফুটবলার মোহাম্মদ রফিকের সাক্ষাৎকার।
প্রশ্ন ১: ছোটবেলায় ফুটবলের প্রতি টান কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
রফিক: ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় ফুটবলই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের জায়গা। স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে চলে যেতাম। তখন কোনও বড় স্বপ্ন ছিল না, শুধু খেলাটাকে ভালো লাগত। পায়ে বল পেলেই যেন সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যেত। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব সাধারণ ছিল, তাই বড় সুযোগ বা একাডেমিতে যাওয়ার সুযোগ সহজে পাইনি। কিন্তু ইচ্ছে থাকলে রাস্তা বের হয়। পাড়ার বড়রা বলতেন, আমার খেলায় কিছু আলাদা আছে। সেই কথাগুলো আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিত। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, শুধু শখের জন্য নয়, ফুটবলকে জীবন হিসেবেও নেওয়া যায়।
প্রশ্ন ২: টালিগঞ্জ অগ্রগামীতে আপনার শুরুর দিনগুলো কতটা কঠিন ছিল?
রফিক: শুরুর দিনগুলো সত্যিই সংগ্রামের ছিল। নতুন জায়গায় গিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, সিনিয়রদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, নিয়মিত অনুশীলনের চাপ— সব কিছুই নতুন ছিল। অনেক সময় মনে হয়েছে আমি পারব তো? কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম, সুযোগ কেউ হাতে তুলে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়। তাই অনুশীলনে কখনও ফাঁকি দিইনি। কোচ যা বলতেন, মন দিয়ে শুনতাম। মাঠে সময় কম পেলেও হতাশ হতাম না। আমি জানতাম, আজ না হলে কাল সুযোগ আসবেই। সেই সময়টা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত করেছে। ফুটবলার হিসেবে শুধু দক্ষতা নয়, ধৈর্য কতটা জরুরি, সেটা আমি টালিগঞ্জে থেকেই শিখেছি।
প্রশ্ন ৩: প্রয়াগ ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর ক্যারিয়ারে কী বদল আসে?
রফিক: প্রয়াগ ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর আমার ফুটবল জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। সেখানে গিয়ে বুঝলাম পেশাদার ফুটবলের আসল মানে কী। প্রতিদিনের অনুশীলন, ম্যাচের প্রস্তুতি, কৌশলগত পরিকল্পনা— সব কিছুই অনেক বেশি উচ্চমানের ছিল। কোচেরা আমার ওপর ভরসা দেখিয়েছিলেন, সেটাই সবচেয়ে বড় শক্তি দেয়। আমি মিডফিল্ডে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করি। সেখানে খেলার সময় অনেক বড় বড় ফুটবলারের সঙ্গে মাঠ ভাগ করেছি, তাদের দেখে শিখেছি। নিজের খেলার গতি, পাসিং, ম্যাচ বোঝার ক্ষমতা— সবই উন্নত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম যে দেশের বড় মঞ্চেও আমি সফল হতে পারি।
প্রশ্ন ৪: প্রথম মরশুমে গোল করার স্মৃতি আজও মনে আছে?
রফিক: প্রথম গোলের স্মৃতি কোনও ফুটবলারের জীবন থেকে কখনও মুছে যায় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই। ম্যাচে যখন বলটা জালে জড়াল, কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সব কিছু থেমে গিয়েছিল। তারপর সতীর্থরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই অনুভূতি ভাষায় বলা কঠিন। একজন মিডফিল্ডার হিসেবে দায়িত্ব সাধারণত খেলা তৈরি করা, কিন্তু গোল করলে আলাদা আনন্দ হয়। সেই গোল আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল যে আমি শুধু দলে জায়গা ধরে রাখার জন্য নই, ম্যাচের ফলও বদলাতে পারি। এরপর থেকে মাঠে আরও সাহসী হয়ে খেলতে শুরু করি। আজও যখন সেই মুহূর্ত মনে পড়ে, মনে হয় সেটাই ছিল বড় স্বপ্নের পথে প্রথম সত্যিকারের পদক্ষেপ।
প্রশ্ন ৫: ইস্টবেঙ্গলে সই করার দিনটা কতটা আবেগের ছিল?
রফিক: ইস্টবেঙ্গলের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে সই করা আমার কাছে খুব আবেগের মুহূর্ত ছিল। ছোটবেলায় টিভিতে বা মাঠে এই ক্লাবের ম্যাচ দেখেছি, সমর্থকদের আবেগ দেখেছি। তখন ভাবতাম, যদি কোনওদিন এই জার্সি গায়ে চাপাতে পারি! যখন সত্যিই সেই সুযোগ এল, মনে হয়েছিল একটা স্বপ্ন পূরণ হল। পরিবারও খুব খুশি হয়েছিল। তারা জানত আমি কত কষ্ট করে এই জায়গায় পৌঁছেছি। ইস্টবেঙ্গলে খেলার চাপও অনেক, কারণ সমর্থকদের প্রত্যাশা সবসময় আকাশছোঁয়া। কিন্তু সেই চাপই আমাকে আরও ভালো খেলতে শিখিয়েছে। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ক্লাবের সম্মান রাখার।
প্রশ্ন ৬: আইএসএল ফাইনালে শেষ মুহূর্তের গোল, সেই অনুভূতি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
রফিক: সেই মুহূর্তটা আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। ম্যাচ শেষের দিকে, চাপ প্রচণ্ড, সবাই অপেক্ষা করছে কী হবে। কর্নার থেকে বল এল, আমি সুযোগটা কাজে লাগালাম। বল জালে যেতেই যেন পুরো স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয়েছিল। সতীর্থরা আমাকে ঘিরে ধরেছিল, সমর্থকদের উল্লাস কানে বাজছিল। একজন ফুটবলারের জীবনে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না। ফাইনালে জয়সূচক গোল করা মানে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া। সেই গোল শুধু ট্রফি দেয়নি, আমার ক্যারিয়ারেও আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। এখনও অনেকে সেই গোলের কথা বলেন, এটা শুনে ভালো লাগে।
প্রশ্ন ৭: ভারতের জার্সিতে অভিষেকের দিনটা কেমন ছিল?
রফিক: দেশের জার্সি পরে মাঠে নামার অনুভূতি আলাদা। ক্লাব ফুটবলে যতই খেলুন না কেন, জাতীয় দলের জার্সির আবেগ অন্যরকম। যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল, তখন শরীরে কাঁটা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এতদিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। পরিবারের কথা মনে পড়ছিল, যারা সবসময় পাশে ছিল। মাঠে নামার পর নার্ভাস লাগলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাই। তারপর শুধু চেষ্টা করেছি দেশের জন্য সেরাটা দিতে। অভিষেক ম্যাচ আমাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। বুঝেছি, এখানে শুধু নিজের জন্য নয়, কোটি মানুষের আশা নিয়েও খেলতে হয়।
প্রশ্ন ৮: জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল করার স্মৃতি কতটা বিশেষ?
রফিক: জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল করা আমার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি। যখন গোল করলাম, মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি। দেশের হয়ে গোল করার আনন্দ কোনও কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ক্লাবের গোলও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দেশের জন্য গোল করলে গর্বটা অন্য মাত্রার হয়। সেই গোলের পর সতীর্থরা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল, কোচও খুশি ছিলেন। ম্যাচ শেষে পরিবারের ফোন পেয়েছিলাম, তারা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। ওই মুহূর্তটা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছিল। মনে হয়েছিল, আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে দেশের ফুটবলকে।
প্রশ্ন ৯: এত সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
রফিক: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। অনেক সময় সুযোগ কম এসেছে, অনেক সময় চোট পেয়েছি, আবার অনেক সময় সমালোচনাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি কখনও হাল ছাড়িনি। ফুটবল জীবনে ওঠা-নামা থাকবেই, সেটা মেনে নিতে হয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা খুব জরুরি। খারাপ সময় আমাকে আরও শক্ত করেছে। আমি সবসময় ভেবেছি, আজ যা হচ্ছে সেটা স্থায়ী নয়, পরিশ্রম করলে ভালো সময় ফিরবেই। এই মানসিকতাই আমাকে এগিয়ে রেখেছে।
প্রশ্ন ১০: তরুণ ফুটবলারদের জন্য আপনার বার্তা কী?
রফিক: আমি বলব, স্বপ্ন দেখো, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে কঠোর পরিশ্রম করো। শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর শেখার মানসিকতা দরকার। অনেক সময় দ্রুত সাফল্য না এলে হতাশা আসে, কিন্তু তখনই ধৈর্য ধরতে হয়। কোচদের সম্মান করো, সিনিয়রদের থেকে শেখো, শরীরের যত্ন নাও। আর সবচেয়ে বড় কথা, খেলাটাকে ভালোবাসো। যদি সত্যি ভালোবাসা থাকে, তাহলে কঠিন সময়ও তোমাকে থামাতে পারবে না। আমি নিজের জীবন থেকে এটাই শিখেছি।
মোহাম্মদ রফিকের গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্য নয়, এটি লড়াই, ধৈর্য আর স্বপ্নপূরণের কাহিনি। ছোট মাঠ থেকে দেশের জার্সি পর্যন্ত তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে, নিষ্ঠা আর খেলার প্রতি ভালোবাসা থাকলে সবই সম্ভব। আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম।




















