মেহেদি হেদায়েতুল্লা: ভোটের (Bengal Election 2026) আগে বাংলার রাজনীতিতে এক অদ্ভুত শব্দ ঘোরাফেরা করে, ‘ভাতা’। কেউ বলেন সামাজিক সুরক্ষা, কেউ বলেন ভোটের প্রলোভন। কিন্তু যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁদের কাছে এটা রাজনীতির শব্দ নয়; বরং সংসারের টানাটানির মাঝে একটু নিশ্বাস ফেলার সুযোগ।
২০২১ সালে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ চালু হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে অনেকে বলেছিলেন, এটা কেবল নির্বাচনী চাল। কিন্তু বাস্তব বলছে, গ্রামীণ বাংলার বহু মহিলার হাতে মাসিক কিছু নগদ অর্থ পৌঁছনো সংসারের ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে। চায়ের দোকানে, পাড়ার আড্ডায়, এমনকি ভোটকেন্দ্রেও সেই প্রভাব অনুভূত হয়েছিল। শাসকদল তার সুফল পেয়েছিল বলেই রাজনৈতিক মহলে প্রায় সর্বসম্মত মত।
এবার ভোটের আগে আর এক প্রকল্প, ‘যুবসাথী’। লক্ষ্য ২১ থেকে ৪০ বছরের কর্মহীন, অন্তত মাধ্যমিক উত্তীর্ণ যুবক-যুবতী। মাসে ১৫০০ টাকা। ১ এপ্রিল থেকে ভাতা। বিধানসভা এলাকায় এলাকায় শিবির। লম্বা লাইন। আবেদনপত্রের বান্ডিল।
এই লাইনই এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু।
বিরোধী শিবিরের একাংশ বলছে, এই ভিড় প্রমাণ করে রাজ্যে কর্মসংস্থানের সংকট কত গভীর। এত সংখ্যক তরুণ-তরুণী কাজ পাচ্ছেন না বলেই তাঁরা ১৫০০ টাকার জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। অর্থাৎ সরকার ব্যর্থ, এটাই মূল বার্তা।
অন্য অংশের হিসাব আলাদা। তাঁদের মতে, ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ যেমন একচেটিয়া মহিলা ভোটের সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছিল, তেমন না হলেও যুবসাথী তরুণ ভোটব্যাঙ্কে একটা নরম জায়গা তৈরি করবে। কারণ, ভাতা সরাসরি ব্যাঙ্কে। কোনও মধ্যস্থতাকারী নেই। ফলে কৃতজ্ঞতার রাজনীতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
১৫০০ টাকা, একটা পরিবারের জন্য হয়তো খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকায় মাসিক এই অর্থ দিয়ে অন্তত মোবাইল রিচার্জ, কোচিং ফি, যাতায়াত খরচ, বা ছোটখাটো সংসার খরচ মেটানো যায়। ফলে প্রকল্পের বাস্তব প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।
তবু অন্য দিকও আছে। তরুণ সমাজের একাংশ বলছে, “আমরা ভাতা চাই না, কাজ চাই।” এই বক্তব্যও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। বিশেষত শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে। তাঁদের মতে, ভাতা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।
এই দ্বন্দ্বটাই আসল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ ছিল নারী-কেন্দ্রিক। তার মধ্যে সামাজিক ক্ষমতায়নের একটা স্পষ্ট বার্তা ছিল। যুবসাথী তেমন কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গভিত্তিক প্রকল্প নয়। এখানে শিক্ষার মানদণ্ড আছে, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। ফলে সবচেয়ে প্রান্তিক, অশিক্ষিত যুবকেরা এর বাইরে।
এই সীমারেখাই রাজনৈতিক প্রভাবকে কিছুটা সীমিত করতে পারে। কারণ যাঁরা উপকৃত হবেন, তাঁরা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত। তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রশ্ন করার ক্ষমতা বেশি। ফলে একতরফা সমর্থন নিশ্চিত নয়।
বিরোধীরা ইতিমধ্যে কর্মসংস্থান ইস্যুতে সরব। তাঁদের বক্তব্য, ভাতা দিয়ে বেকারত্ব ঢেকে রাখা যায় না। শিল্প, বিনিয়োগ, স্থায়ী চাকরি, এসবেই জোর দেওয়া উচিত। শিবিরের লাইন দেখিয়ে তাঁরা বলছেন, “দেখুন, কত যুবক কাজহীন।”
কিন্তু এখানেই এক বিপদ। যদি বিরোধীরা প্রকল্পটিকে সরাসরি বাতিল করার কথা বলেন, তাহলে উপকৃতদের একাংশ ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কারণ রাজনীতির বাইরে, ভাতা তাঁদের কাছে বাস্তব সাহায্য।
শাসকদলের কাছে এই প্রকল্প এক ঢিলে দুই পাখি। একদিকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, অন্যদিকে প্রশাসনিক তৎপরতার প্রদর্শন। প্রতি বিধানসভা এলাকায় শিবির মানে স্থানীয় স্তরে সংগঠনের সক্রিয়তা। আবেদন নেওয়া, যাচাই, ব্যাঙ্ক লিঙ্ক, সব মিলিয়ে দলীয় কর্মীদেরও সক্রিয় রাখা।
তবে ঝুঁকিও আছে। যদি আবেদন প্রক্রিয়ায় গাফিলতি, বঞ্চনা বা পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা উল্টো ফল দিতে পারে। প্রত্যাশা তৈরি করে তা পূরণ না হলে ক্ষোভ বেশি হয়।
ভোট কেবল অর্থনীতির অঙ্ক নয়, আবেগেরও। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ক্ষেত্রে নারী ভোটে সুস্পষ্ট স্রোত তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। যুবসাথী তেমন একক ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করবে কি না, তা অনিশ্চিত।
কারণ যুবসমাজ বহুমুখী। কেউ উচ্চশিক্ষিত, কেউ সবে মাধ্যমিক পাস। কেউ শহরে কোচিং নিচ্ছে, কেউ গ্রামে কৃষিকাজের ফাঁকে কাজ খুঁজছে। তাঁদের প্রত্যাশা এক নয়। ফলে একটিমাত্র প্রকল্প দিয়ে সবার মন জেতা কঠিন।
তবে এটুকু নিশ্চিত, যাঁরা সরাসরি উপকৃত হবেন, তাঁদের মনে প্রকল্পের স্মৃতি থাকবে। ভোটের বাক্সে সেই স্মৃতি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সামগ্রিক রাজনৈতিক আবহ, বিরোধীদের প্রচার, এবং কর্মসংস্থানের বৃহত্তর চিত্রের উপর।
ভাতা না ভবিষ্যৎ?
ভোটের আগে ভাতা নিয়ে চর্চা নতুন নয়। কিন্তু এই চর্চার ভিতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক বাস্তব, কর্মহীনতার কষ্ট। যুবসাথী প্রকল্প সেই কষ্টের ওপর সাময়িক প্রলেপ। প্রশ্ন হল, প্রলেপই কি যথেষ্ট?
ভোটের ময়দানে শাসক ও বিরোধী উভয়েরই হিসাব চলছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ-তরুণীর কাছে হিসাবটা সহজ, মাসের শেষে কিছু টাকা। সেই টাকায় একটু স্বস্তি।
সম্ভবত উত্তর লুকিয়ে আছে এই দুই প্রশ্নের মাঝখানে। ভোটের আগে ভাতা নিয়ে যতই তরজা হোক, শেষ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে, “আমার ভবিষ্যৎ কোথায়?”
যদি ভাতা সেই ভবিষ্যতের দিকে এক ধাপ এগোনোর সেতু হয়, তবে তা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবেই। আর যদি তা কেবল সাময়িক সান্ত্বনা হয়, তবে ভোটের অঙ্কে তার প্রভাবও সাময়িক থাকবে।
ভোটের আগে বাংলার রাজনীতি আবহে তাই এখন এক নতুন প্রশ্ন ভাসছে, ভাতা কি ভোট নির্ধারণ করবে, না ভবিষ্যতের স্বপ্ন?




















