স্কুলছুটের শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ও এক অবিজেপি শাসিত রাজ্য

দেশের সরকারি স্কুলগুলির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বড়সড় উদ্বেগ তৈরি করল কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সদ্য প্রকাশিত UDISE+ ২০২৪-২৫ (Unified District Information System for Education Plus)…

west-bengal-telangana-top-school-dropout-udise-plus-report

দেশের সরকারি স্কুলগুলির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বড়সড় উদ্বেগ তৈরি করল কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সদ্য প্রকাশিত UDISE+ ২০২৪-২৫ (Unified District Information System for Education Plus) রিপোর্ট। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ১০ লক্ষ ১৩ হাজার সরকারি স্কুলের মধ্যে ৫,১৪৯টি স্কুলে একজন ছাত্রও নেই। পাশাপাশি, ৬৫,০৫৪টি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১০ জনেরও কম। অর্থাৎ বিপুল পরিকাঠামো, শিক্ষক ও বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বহু স্কুল কার্যত ছাত্রশূন্য বা প্রায় বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।

Advertisements

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হল—এই শূন্য ছাত্রসংখ্যার স্কুলগুলির প্রায় ৭০ শতাংশই মাত্র দুটি রাজ্যে অবস্থিত, যার একটি পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যটি একটি অবিজেপি শাসিত রাজ্য, তেলেঙ্গানা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দুই রাজ্যে মিলিয়ে প্রায় ৩,৬৫২টি স্কুলে কোনও ছাত্র নেই। দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে রাজ্য সরকারের শিক্ষানীতির কার্যকারিতা নিয়ে।

   

কেন এত স্কুলে নেই পড়ুয়া?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণ এর জন্য দায়ী। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে অভিবাসন, জন্মহারের পতন, বেসরকারি স্কুলের প্রতি ঝোঁক এবং সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে অনাস্থা—সব মিলিয়েই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে দেখা যাচ্ছে, স্কুল ভবন থাকলেও সেখানে ছাত্র নেই। কোথাও একজন বা দু’জন শিক্ষক নিয়মিত আসেন, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে বসার মতো পড়ুয়া নেই।

তেলেঙ্গানার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আলাদা নয়। শহরমুখী জনস্রোত এবং বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বিস্তারের ফলে সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কম পড়ুয়ার স্কুলগুলিতে প্রায় ১ লক্ষ ৪৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত, যাঁদের একটি বড় অংশ কার্যত পর্যাপ্ত ছাত্র না থাকায় পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

প্রশ্নের মুখে সম্পদ বণ্টন

এই রিপোর্ট সামনে আসতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একদিকে সরকারি স্কুলে পড়ুয়া নেই, অন্যদিকে বহু এলাকায় এখনও শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের অভাব ও মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতির অভিযোগ। শিক্ষাবিদদের একাংশের প্রশ্ন—যেখানে ছাত্র নেই, সেখানে স্কুল ও শিক্ষক ধরে রাখার অর্থ কী? আবার অনেকের মতে, গ্রামাঞ্চলের শেষ আশ্রয় হিসেবে সরকারি স্কুল বন্ধ করা হলে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা আরও বেশি শিক্ষাবঞ্চিত হবে।

রিপোর্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে একটি ছবি—একটি সক্রিয়, ভরপুর ছাত্রে ভর্তি শ্রেণিকক্ষের। সেই ছবির সঙ্গে তুলনা টেনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন দেশের বহু সরকারি স্কুলে এমন চিত্র দেখা যায় না? কেন সরকারি অর্থ খরচ হলেও শিক্ষার গুণগত মান বাড়ছে না?

রাজনীতির রঙও লেগেছে বিতর্কে

এই তথ্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ ও তেলেঙ্গানার মতো অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতা স্পষ্ট। অন্যদিকে রাজ্য সরকারগুলির পাল্টা দাবি, কেন্দ্রীয় রিপোর্টে শুধু সংখ্যার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা ও ভৌগোলিক সমস্যাগুলি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ভবিষ্যৎ পথ কী?

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হল স্কুল একীকরণ (school merger), শিক্ষক পুনর্বিন্যাস এবং পড়ুয়া টানতে গুণগত মানের উন্নতি। শুধু স্কুল ভবন থাকলেই হবে না, অভিভাবকদের আস্থা ফেরাতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষা, মিড-ডে মিলের মানোন্নয়ন এবং স্থানীয় স্তরে নজরদারি বাড়ানো ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

UDISE+ রিপোর্ট একথা স্পষ্ট করে দিয়েছে—ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সমস্যা শুধু বাজেটের নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের। আর সেই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

Advertisements