
কলকাতা: কলকাতায় আরএসএস-এর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র ও হিন্দুত্বের ধারণা নিয়ে স্পষ্ট ও বিতর্কিত মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর দাবি, ভারত ইতিমধ্যেই একটি হিন্দু রাষ্ট্র, এর জন্য কোনও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। কারণ, তাঁর ভাষায়, “এটাই সত্য”।
সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রবিবার কলকাতায় একটি সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, ভারতের হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং তা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। তিনি সূর্যোদয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, “সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে—এটা কবে থেকে হচ্ছে আমরা জানি না। তার জন্য কি সাংবিধানিক অনুমোদন দরকার? তেমনই হিন্দুস্থান একটি হিন্দু রাষ্ট্র।”
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধারণা
আরএসএস প্রধানের বক্তব্যে উঠে আসে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধারণা। তিনি বলেন, “যাঁরা ভারতকে নিজের মাতৃভূমি বলে মানেন, ভারতীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করেন, আর যতদিন এই ভূমিতে এমন একজন মানুষও বেঁচে থাকবেন যিনি ভারতীয় পূর্বপুরুষদের গৌরবকে ধারণ করেন, ততদিন ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্রই থাকবে।”
সংবিধানে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ শব্দবন্ধ যুক্ত করা নিয়ে আরএসএস-এর কোনও আগ্রহ নেই বলেও স্পষ্ট করে দেন ভাগবত। তাঁর কথায়, “সংসদ যদি কখনও সংবিধান সংশোধন করে সেই শব্দ যোগ করে, করুক। না করলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আমরা সেই শব্দে আগ্রহী নই। আমরা হিন্দু, আর আমাদের দেশ হিন্দু রাষ্ট্র—এটাই বাস্তব।” একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জন্মভিত্তিক জাতিভেদ বা কাস্ট সিস্টেম হিন্দুত্বের মূল বৈশিষ্ট্য নয়।
বিদেশি প্রভাব থেকে সরে আসার বার্তা
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে মোহন ভাগবত বিদেশি প্রভাব থেকে সরে আসার বার্তাও দেন। বাংলা ভাষাভাষীদের উদ্দেশে তাঁর মন্তব্য, “আপনি যদি বাঙালি হন, তবে বাড়ির দরজায় ‘Welcome’ না লিখে ‘স্বাগতম’ লিখুন।” তাঁর মতে, মাতৃভাষার ব্যবহারই সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
আরএসএস সম্পর্কে প্রচলিত সমালোচনা ও অভিযোগ প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন সংঘ প্রধান। তাঁর দাবি, একটি অংশের মধ্যে আরএসএস নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা মূলত “ভ্রান্ত প্রচার”-এর ফল। তিনি বলেন, আরএসএস একটি দৃঢ় জাতীয়তাবাদী সংগঠন হলেও তা কোনওভাবেই মুসলিম-বিরোধী নয় এবং সংগঠনের কাজকর্ম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ।
মুসলিম বিরোধী নই
“যদি কেউ মনে করেন আমরা মুসলিম-বিরোধী, তাহলে যে কেউ এসে আমাদের কাজ দেখে যেতে পারেন। যদি সত্যিই এমন কিছু দেখেন, তাহলে নিজের মত রাখুন। আর যদি না দেখেন, তাহলে মত বদলান,” বলেন ভাগবত। তাঁর সংযোজন, আরএসএস সম্পর্কে বোঝার অনেক কিছু আছে, কিন্তু কেউ যদি বুঝতেই না চান, তাহলে কারও পক্ষে তাঁর মন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন আরএসএস প্রধান। তাঁর দাবি, সংঘের কোনও রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে “ভারত-বিরোধী ও সংঘ-বিরোধী” প্রচার বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, হিন্দুত্বের উত্থানে আতঙ্কিত কিছু “অসৎ মানুষ” এই ধরনের প্রচারের নেপথ্যে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা থেকে দেওয়া মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য আবারও হিন্দুত্ব, রাষ্ট্রের চরিত্র ও সংবিধান নিয়ে জাতীয় স্তরের বিতর্কে নতুন করে ইন্ধন জোগাল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।









