
শীতকালীন সংসদ অধিবেশনে নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে আলোচনার সময় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) ‘ভোট চুরি’ বা ভুয়ো ভোটদানের ঘটনাকে সরাসরি দেশবিরোধী কাজ বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ—ভারতের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি), ধীরে ধীরে দখল করে নিয়েছে জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকেই আধুনিক ও স্বচ্ছ প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে।
রাহুলের বক্তব্যে উঠে আসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। প্রথমত, তিনি দাবি করেন—মেশিন-রিডেবল ভোটার তালিকা চালু করা হোক, যাতে মানবিক ত্রুটি বা ইচ্ছাকৃত কারচুপি রোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, তিনি EVM বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের আর্কিটেকচার সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলিকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ—EVM ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামো এখনো স্বচ্ছ নয়, যার জেরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই কমছে।
রাহুল আরও প্রশ্ন তোলেন কেন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেল থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হলো। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন সরাসরি স্বচ্ছতা হ্রাস করে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন হরিয়ানার সাম্প্রতিক নির্বাচনে সংঘটিত কথিত অনিয়ম, যা তাঁর মতে ‘ভোট চুরি’র প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে রাহুলের অভিযোগকে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন হল দেশের অন্যতম নিরপেক্ষ ও কার্যকরী প্রতিষ্ঠান, যাকে রাজনৈতিক স্বার্থে আক্রমণ করা হচ্ছে। দুবের অভিযোগ—কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করেছে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কংগ্রেসের আমলেই UPSC, CBI-সহ বিভিন্ন সংস্থা রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছিল। দুবে আরও উল্লেখ করেন ঝাড়খণ্ডের সাঁথাল পরগনা অঞ্চলের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কথা। তাঁর বক্তব্য, এই অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যার ভারসাম্যে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেটি রাজনৈতিক কৌশলের ফল এবং এতে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। রাহুল ও দুবের এই বিতর্ক থেকে স্পষ্ট যে, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়, বরং দিন দিন তীব্র হচ্ছে। একদিকে বিরোধীরা দাবি করছেন—নির্বাচনী ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কারচুপি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে; অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি বলছে—বিরোধীরা ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা কমানোর চেষ্টা করছে।
রাহুলের বক্তব্য জনমতের একাংশে সাড়া ফেলেছে—বিশেষত যেখানে EVM ব্যবহারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। তবে দুবের পাল্টা যুক্তিও রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে, কারণ তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন যে কংগ্রেসের নিজস্ব শাসনকালেও প্রতিষ্ঠানগুলির অপব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। এই তীব্র বাকযুদ্ধ আসলে ভারতের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা—নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনী প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? ভোটার তালিকা কতটা নির্ভুল? EVM সত্যিই কারচুপি-অযোগ্য কি না? —এই প্রশ্নগুলি এখন সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহলেও সমানভাবে আলোচিত।










