
কলকাতা: বঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন শেষে প্রকাশ পেল খসড়া তালিকা (Voter List Revision in West Bengal)। এখনও পর্যন্ত ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়াকে ঘিরে যেমন প্রশাসনিক ব্যাখ্যা সামনে আসছে, তেমনই রাজনৈতিক তরজা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
কারণ, সাধারণ বুথের পাশাপাশি বাদ পড়া ভোটারের তালিকায় উঠে এসেছে রাজ্যের দুই হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বুথের তথ্যও। এই তথ্য সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ, আর তার বাস্তব প্রভাবই বা কী হতে চলেছে।
ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলা: ইডির মানি লন্ডারিং মামলা গ্রহণ করল না দিল্লি আদালত
খসড়া তালিকা অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রাম (২১০)-এর অন্তর্গত বুথ নম্বর ৭৯, নন্দনায়কবাড় প্রাইমারি স্কুলে মোট ১১ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কেন্দ্রে এই তথ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র ঘিরে যে টানটান লড়াই দেখা গিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে এখানকার প্রতিটি ভোটারই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বুথ স্তরে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি ঘিরে স্থানীয় স্তরে আলোচনাও শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুর (১৫৯)-এর বুথ সংক্রান্ত তথ্য। ভবানীপুরের বুথ নম্বর ২০৭, মিত্র ইনস্টিটিউশন (ভবানীপুর ব্রাঞ্চ)-এ খসড়া তালিকা অনুযায়ী এক ধাক্কায় ১২৭ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। একটি মাত্র বুথে এত সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ভবানীপুর দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, আর মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার ভোটার তালিকার প্রতিটি পরিবর্তন আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এই বিশেষ সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত নাম থাকা ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা। আধার লিঙ্কিং, বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা এবং ডিজিটাল ডেটাবেস মিলিয়ে দেখার পরই এই খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে কমিশনের দাবি। তবে রাজনৈতিক দলগুলির একাংশের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বহু প্রকৃত ভোটারের নামও ভুলবশত বাদ পড়তে পারে, যা আগামী নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করবে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই দাবি করা হয়েছে, খসড়া তালিকা হওয়ায় এখনও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে এবং যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা যথাযথ নথি জমা দিয়ে ফের নাম তুলতে পারবেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্ব এই ঘটনাকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে এবং দাবি করছে, ভোটার তালিকা নিয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খসড়া তালিকা প্রকাশের পরবর্তী সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ের মধ্যেই দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। যদি সাধারণ মানুষ সচেতন না হন, তবে বহু ভোটার চূড়ান্ত তালিকায় নিজেদের নাম ফিরে নাও পেতে পারেন।
ফলে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার তথ্য যেমন প্রশাসনিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই রাজনৈতিক দিক থেকেও তা আগামী নির্বাচনের আগে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। মমতার বুথে শতাধিক নাম বাদ পড়া এবং শুভেন্দুর বুথে নাম কাটার খবর দুটো মিলিয়ে বাংলার ভোট রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন ও উত্তেজনার সৃষ্টি করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।










