কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই যে বড়সড় গরমিল রয়েছে, (West Bengal)তারই এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এল সুপ্রিম কোর্টে। সোমবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নির্বাচন কমিশন (EC) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী তালিকায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে একজন ব্যক্তিকে শত শত ভোটারের বাবা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তরফে শীর্ষ আদালতে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল জেলার বারাবানি বিধানসভা কেন্দ্র (নম্বর ২৮৩)-এ এক ব্যক্তিকে মোট ৩৮৯ জন ভোটারের বাবা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। একই ধরনের আরেকটি উদাহরণ মিলেছে হাওড়া জেলার বালি বিধানসভা কেন্দ্র (নম্বর ১৬৯)-এ, যেখানে এক ব্যক্তির নাম রয়েছে ৩১০ জন ভোটারের বাবার জায়গায়।
অগ্নিগর্ভ বাংলা! বেলডাঙ্গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি শাসনের ইঙ্গিত হাইকোর্টের ?
এই তথ্য তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চকে জানান, এ ধরনের ভুলকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা যুক্তিগত গরমিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এগুলি সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নোটিস পাঠানো হয়েছে এবং সঠিক তথ্য প্রমাণ করার দায়িত্ব ভোটারদেরই।
নির্বাচন কমিশনের দাখিল করা হলফনামায় আরও বিস্ময়কর পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাত জন ব্যক্তিকে একশোর বেশি ভোটারের বাবা বা অভিভাবক হিসেবে দেখানো হয়েছে। দশ জনের নাম রয়েছে ৫০ জন বা তার বেশি ভোটারের অভিভাবক হিসেবে।
আবার ১৪ জনকে ৩০ জনের বেশি ভোটারের বাবা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ৮,৬৮২ জন ব্যক্তিকে ১০ জনের বেশি ভোটারের বাবা হিসেবে দেখানো হয়েছে, ২ লক্ষ ৬ হাজার ৫৬ জনের ক্ষেত্রে ছয় জনের বেশি এবং ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫৪ জনের ক্ষেত্রে পাঁচ জনের বেশি সন্তানের তথ্য রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (২০১৯-২১) অনুযায়ী, ভারতে গড় পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৪.৪। অর্থাৎ সাধারণত একটি পরিবারে ২ থেকে ৩ জন সন্তান থাকার কথাই স্বাভাবিক। সেখানে কোনও কোনও ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সঙ্গে ৫০ জনেরও বেশি ভোটারের নাম যুক্ত থাকা স্বাভাবিক নয় এবং তা গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই কারণেই কমিশনের সিদ্ধান্ত, যেখানে ছয় জন বা তার বেশি ভোটার একই অভিভাবকের সঙ্গে যুক্ত, সেই সব ক্ষেত্রকে বিশেষ নজরে রেখে যাচাই করা হবে। সম্ভাব্য জালিয়াতি বা ভুল ম্যাপিং চিহ্নিত করতেই নির্বাচনী রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নোটিস পাঠাচ্ছেন বলে জানানো হয়েছে।
শুধু অভিভাবকের সংখ্যার গরমিলই নয়, আরও চার ধরনের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার নামের সঙ্গে ২০০২ সালের বিশেষ ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) তালিকার নামের অমিল, ভোটারের বয়স ও অভিভাবকের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম হওয়া, আবার ৫০ বছরের বেশি হওয়া, কিংবা ভোটারের সঙ্গে দাদু-দিদার বয়সের পার্থক্য ৪০ বছরের কম হওয়া।
নির্বাচন কমিশনের এই তথ্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, ভোটার তালিকায় এই ধরনের গরমিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। অন্যদিকে কমিশনের বক্তব্য, উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়, বরং ভোটার তালিকাকে নির্ভুল ও স্বচ্ছ করে তোলা।
