কলকাতা এড়িয়ে বঙ্গ সফর, রাজ্য রাজনীতিতে নবীন সমীকরণ নিতিনের!

দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার পর প্রথম রাজ্য সফরেই স্পষ্ট বার্তা দিলেন বিজেপির নয়া নেতা নিতিন নবীন (Nitin Naveen)। সেই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু চেনা ছক ভেঙে কলকাতা নয়, তাঁর ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
nitin naveen

দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার পর প্রথম রাজ্য সফরেই স্পষ্ট বার্তা দিলেন বিজেপির নয়া নেতা নিতিন নবীন (Nitin Naveen)। সেই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু চেনা ছক ভেঙে কলকাতা নয়, তাঁর সফরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল শিল্পনগরী দুর্গাপুর। দুই দিনের সফরজুড়ে কলকাতাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া, রাজ্য রাজনীতির বহু পুরনো কলকাতা-কেন্দ্রিক ধ্যানধারণায় কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

মঙ্গলবার অন্ডাল বিমানবন্দরে পা রাখেন নিতিন নবীন। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এবং স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা। সেখান থেকে সরাসরি দুর্গাপুরে গিয়ে হোটেলে সাংগঠনিক বৈঠক করেন তিনি। বিকেলে উদ্বোধন করেন যোগ কমল মেলা। বুধবারও তাঁর কর্মসূচি ঠাসা—দুর্গাপুরেই দলীয় নেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক, বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গের নেতৃত্বের সঙ্গে আলাদা আলোচনা। রাজ্যের রাজধানী ছুঁয়ে না গিয়েই গোটা সফর সেরে ফেলার এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে তৈরি করেছে কৌতূহল ও জল্পনা।

   

সাধারণত পশ্চিমবঙ্গে কোনও সর্বভারতীয় নেতার সফর মানেই কলকাতা দিয়ে শুরু। প্রথমে শহরে বৈঠক, তারপর জেলায় কর্মসূচি—এই রীতি দীর্ঘদিনের। বিজেপির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। কিন্তু নিতিন নবীন সেই রীতিতে ইচ্ছাকৃত ছেদ টানলেন। পশ্চিম বর্ধমানকে ঘাঁটি করে রাজ্যস্তরের নেতাদেরও সেখানে ডেকে পাঠালেন তিনি। এর ফলে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হল এক নতুন সমীকরণ, যেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে কলকাতার বাইরের অঞ্চল, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও রাঢ়বঙ্গ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতা-কেন্দ্রিকতার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির অন্যতম অভিযোগ—রাজ্যের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সবই নাকি দক্ষিণ কলকাতায় কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নজরও বৃহত্তর কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ। নিতিন নবীনের দুর্গাপুর সফরকে সেই অভিযোগের বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিউত্তর বলেই দেখছেন অনেকে। তাঁদের মতে, কলকাতার বাইরের ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছতেই এই কৌশল।

রাঢ়বঙ্গের গুরুত্ব বিজেপির কাছে নতুন নয়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলে তুলনামূলক ভালো ফল করেছিল গেরুয়া শিবির। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বড় ধাক্কা খেয়েছে দল। সেই হারানো জমি পুনরুদ্ধারই নিতিন নবীনের সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় শ্রমিক, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রশ্নও এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—যা বিজেপির রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে সহজেই মেলে।

রাঢ়বঙ্গের দাপট নিয়ে বিজেপির এক শীর্ষ নেতার মন্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কথায়, “রাঢ়বঙ্গে আমাদের ভোট শতাংশ কমেনি। তৃণমূল লুট করে জিতেছে। ২০২৬-এর ভোটে আর চুরি করতে পারবে না। আমরা করতে দেব না। মানুষ খেলবে।” এই বক্তব্য স্পষ্ট করছে যে বিজেপি ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখেই এখন থেকে রণকৌশল সাজাতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে, কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিজেপির সংগঠন তুলনামূলক দুর্বল এবং গোষ্ঠীকোন্দলও প্রবল—এ কথা অস্বীকার করেন না অনেকেই। তাই ঝুঁকি এড়িয়ে চেনা মাঠে খেলাই নিতিন নবীনের প্রথম পছন্দ হতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। “হোম ম্যাচে জয় নিশ্চিত করে তবেই অ্যাওয়ে ম্যাচ”—এই কৌশলেই এগোচ্ছে বিজেপি, এমন ব্যাখ্যাও উঠে আসছে।

সব মিলিয়ে, কলকাতাকে এড়িয়ে দুর্গাপুরে ঘাঁটি গেড়ে নিতিন নবীন বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর নেতৃত্বে বিজেপির বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই সফর শুধু একটি সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়, বরং রাজ্য রাজনীতিতে নয়া সমীকরণের ইঙ্গিত—যার প্রভাব আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google