পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে এবার সংস্কৃত, গীতা–মহাভারত

pakistan-university-introduces-sanskrit-language-cours

ইসলামাবাদ: দক্ষিণ এশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল (Sanskrit taught in Pakistan university)পাকিস্তান। দেশভাগের পর এই প্রথমবার পাকিস্তানের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্কৃত ভাষা শেখানো শুরু হয়েছে। লাহোরের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লাহোর য়ুনিভার্সিটি অফ ম্যানেজমেন্ট সাইন্স এ চালু হয়েছে সংস্কৃত ভাষার একটি কোর্স, যেখানে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে থাকছে মহাভারত ও ভগবদ্গীতার শ্লোক।

‘দ্য ট্রিবিউন’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে এই কোর্সটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিষয় হিসেবে গড়ে উঠছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে এটিকে এক বছরের পূর্ণাঙ্গ কোর্সে রূপান্তর করা হবে। শুরুতে মাত্র তিন মাসের জন্য এই কোর্স চালু হলেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দেখে কর্তৃপক্ষ বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

   

বাতিল হচ্ছেনা মেসি-মুখ্যমন্ত্রী ম্যাচ!

এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন LUMS-এর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর শাহিদ রশিদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সংস্কৃত কোনও একক ধর্মের ভাষা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বন্ধন। তাঁর কথায়, “অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, কেন সংস্কৃত শিখছি। আমি বলি—কেন নয়? সংস্কৃত এই অঞ্চলের সংযোগকারী ভাষা।

পাণিনির গ্রাম এই ভূখণ্ডেই ছিল। সিন্ধু সভ্যতার সময় এই এলাকায় প্রচুর লেখা রচিত হয়েছিল। সংস্কৃত একটি পাহাড়ের মতো একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ। একে আমাদের আপন করে নিতে হবে। এটা শুধু কারও ধর্মের নয়, আমাদের সকলের।” এই বক্তব্য পাকিস্তানের একাডেমিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু করেছে। বহু শিক্ষাবিদ মনে করছেন, এই পদক্ষেপ উপমহাদেশের ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি করবে।

LUMS-এর গুরমানি সেন্টারের ডিরেক্টর আলি উসমান কাসিমি এই উদ্যোগকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে থাকা সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিগুলির সঙ্গে দেশের শিক্ষাবিদদের কোনও সংযোগ ছিল না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “১৯৩০-এর দশকে পণ্ডিত জেসি আর উলনার পাকিস্তানে থাকা বহু সংস্কৃত তালপাতার পাণ্ডুলিপির তালিকা তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে কোনও পাকিস্তানি গবেষক এই সংগ্রহ নিয়ে কাজ করেননি। শুধু বিদেশি গবেষকরাই সেগুলি ব্যবহার করেছেন। আমরা যদি দেশেই গবেষক তৈরি করতে পারি, তাহলে এই চিত্র বদলাবে।” কাসিমি আরও বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পাকিস্তান থেকেই গীতা ও মহাভারতের বিশেষজ্ঞ গবেষক উঠে আসতে পারেন। তাঁর মতে, ভাষা শেখার মাধ্যমে শুধু সাহিত্য নয়, ইতিহাস, দর্শন এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতাকেও বোঝা সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কোর্সে এখনও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও আগ্রহ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, আগামী কয়েক বছরে আরও বেশি ছাত্রছাত্রী এই বিষয় বেছে নেবে। কাসিমি বলেন, “প্রথমে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিই এটিকে স্থায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সে রূপান্তর করা হবে। লক্ষ্য ২০২৭ সালের বসন্ত সেমিস্টার থেকে এক বছরের কোর্স চালু করা।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সাংস্কৃতিক স্তরেও এক নতুন বার্তা বহন করছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার বাইরে গিয়ে ভাষা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এই প্রয়াস অনেকের কাছেই আশার আলো। সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষার সূচনা দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যেখানে বিভাজনের দেয়াল পেরিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির মিলন ঘটছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন