
দিল্লির নাম শুনলেই বায়ুদূষণের ছবি ভেসে ওঠে শীতকাল (Byrnihat)এলেই ধোঁয়াশায় ঢেকে যায় রাজধানী, বাড়ে দূষণের মাত্রা, নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলছে, ভারতের বায়ুদূষণের শীর্ষে আর দিল্লি নয়। সবুজে ঘেরা উত্তর-পূর্ব ভারতের এক শিল্পনগরীই এখন দেশের সবচেয়ে দূষিত শহর। শহরটির নাম বর্নিহাট (Byrnihat)।
অসম-মেঘালয় সীমান্তে অবস্থিত এই বর্নিহাট মূলত একটি শিল্পাঞ্চল। চারপাশে পাহাড়, বনজঙ্গল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য কলকারখানা। আইকিউএয়ার (IQAir)-এর ‘ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, বর্নিহাটে গত বছরে বার্ষিক গড় PM2.5-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১২৮.২ মাইক্রোগ্রাম। তুলনায় দিল্লিতে এই মাত্রা ছিল ১০৮.৩ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ, জাতীয় রাজধানীকেও পিছনে ফেলে দূষণের শীর্ষে উঠে এসেছে উত্তর-পূর্বের এই শহর।
প্রজাতন্ত্র দিবসের জন্য ১,২৭০ কেজি চিকেন কিনছে মোদী সরকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্নিহাটের দূষণের মূল কারণ অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন। এলাকায় ১০০টিরও বেশি সিমেন্ট কারখানা, স্টোন ক্রাশার ও অন্যান্য ভারী শিল্প রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, ধুলোকণা ও ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে মিশছে। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়, ফলে দূষিত কণা এলাকায় আটকে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বর্নিহাটে PM2.5-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এই সূক্ষ্ম ধূলিকণা মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে সহজেই প্রবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখে জ্বালা, ত্বকের নানা সমস্যা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
বর্নিহাটের এক বাসিন্দা বলেন, “আগে এলাকাটা ছিল সবুজ আর শান্ত। এখন সকাল হলেই ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক। শিশু আর বয়স্কদের অসুস্থতা বেড়েই চলেছে।” চিকিৎসকদেরও মত, দূষণের কারণে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি এই অঞ্চলে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
অন্যদিকে, দিল্লিকে ঘিরে যতটা আলোচনা, নজরদারি ও নীতিগত পদক্ষেপ দেখা যায়, বর্নিহাটের মতো শহরগুলি অনেকটাই থেকে যায় আড়ালে। জাতীয় স্তরে দূষণ মানেই রাজধানী বা বড় মহানগর এই ধারণার বাইরে এসে ছোট ও মাঝারি শিল্পনগরীগুলির দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে এই রিপোর্ট।
পরিবেশবিদদের মতে, অবিলম্বে কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ, শিল্পগুলিতে আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বসানো এবং নিয়মিত মনিটরিং না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। পাশাপাশি, অসম ও মেঘালয় দুই রাজ্যের সমন্বিত উদ্যোগও অত্যন্ত জরুরি, কারণ সীমান্তবর্তী এই এলাকায় দূষণের প্রভাব দুই রাজ্যকেই সমানভাবে ভোগাচ্ছে।
সবুজে মোড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের এই শহর আজ দেশের দূষণের শীর্ষে এই বাস্তবতা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং একটি বড় সতর্কবার্তা। দিল্লির বাইরে তাকিয়ে ভারতের অন্য প্রান্তে লুকিয়ে থাকা পরিবেশ সংকটগুলিকেও যে এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার, বর্নিহাট তার জ্বলন্ত উদাহরণ।










