কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ শুক্রবার রাজ্যসভায় তাঁর মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার জবাবে তামিলনাড়ুর শাসক দল দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম (ডিএমকে)-এর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তিন ভাষা সূত্রের বিরোধিতা করার জন্য ডিএমকে-কে কাঠগড়ায় তুলে তিনি বলেন, ভাষার নামে দেশকে ভাগ করার কোনো চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। তিনি তামিলনাড়ু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, তাদের মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার উপকরণ তামিল ভাষায় অনুবাদ করার সাহস নেই। শাহ আরও ঘোষণা করেন, ডিসেম্বর থেকে তিনি নাগরিক, মুখ্যমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের নিজ নিজ ভাষায় চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করবেন। অমিত শাহ বলেন, “যারা ভাষার নামে দেশকে ভাগ করতে চায়, তাদের পরিকল্পনা যাতে সফল না হয়, সেজন্য আমি কিছু কথা বলতে চাই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের অধীনে সরকারি ভাষা বিভাগে ভারতীয় ভাষা শাখা গঠন করা হয়েছে, যা তামিল, তেলুগু, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, অসমীয়া, বাংলা—সব ভারতীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর জন্য কাজ করবে। ডিসেম্বর থেকে আমি নাগরিক, মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং সাংসদদের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব ভাষায় লিখিত যোগাযোগ করব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি ভাষার নামে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের জন্য একটি জবাব।
ডিএমকে-র নাম না করে শাহ তাদের উপর তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, “যারা দুর্নীতি লুকানোর জন্য ভাষার নামে দোকান চালায়, এটি তাদের জন্য একটি কড়া জবাব। তারা কী বলছে? আমরা দক্ষিণের ভাষার বিরোধিতা করি? এটা কীভাবে সম্ভব? আমি গুজরাট থেকে এসেছি, নির্মলা সীতারমন তামিলনাড়ু থেকে। আমরা কীভাবে এর বিরোধিতা করতে পারি? আপনারা কী বলছেন?” তিনি অভিযোগ করেন, ডিএমকে ভাষার ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আরও বলেন, তামিলনাড়ু সরকারের সাহসের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ভাষার জন্য কাজ করেছি। আমি তামিলনাড়ু সরকারকে বলতে চাই—দু’বছর ধরে আমরা বলছি, আপনাদের মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার উপকরণ তামিলে অনুবাদ করার সাহস নেই। আপনারা এটা করতে পারেন না। যখন তামিলনাড়ুতে এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসবে, আমরা তামিল ভাষায় মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু করব।” তিনি এটিকে তামিলনাড়ুবাসীর জন্য একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভাষা নিয়ে বিষ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে শাহ বলেন, “যারা ভাষার নামে বিষ ছড়ায়, তাদের বলতে চাই—আপনারা হাজার কিলোমিটার দূরের ভাষা পছন্দ করেন, কিন্তু ভারতের ভাষা পছন্দ করেন না। আমি বারবার বলেছি, হিন্দির সঙ্গে অন্য কোনো ভারতীয় ভাষার প্রতিযোগিতা নেই। হিন্দি সব ভারতীয় ভাষার বন্ধু। সব ভাষা হিন্দির থেকে শক্তি পায় এবং হিন্দি সব ভাষা থেকে শক্তি পায়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, হিন্দি কোনো ভাষার উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না, বরং এটি সব ভাষার সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে চলছে। শাহ আরও বলেন, বিজেপি তামিলনাড়ুর প্রতিটি গ্রামে গিয়ে ডিএমকে-র ‘ভুল কাজ’ জনগণের সামনে তুলে ধরবে। তিনি বলেন, “আমরা গ্রামে গ্রামে যাব, জনগণের সঙ্গে কথা বলব এবং ডিএমকে-র ভুলগুলো উন্মোচন করব।” এটি তামিলনাড়ুতে আগামী দিনে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) ২০২০-এর অংশ হিসেবে তিন ভাষা সূত্র বাস্তবায়ন নিয়ে কেন্দ্র ও তামিলনাড়ু সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। তামিলনাড়ু সরকার এই নীতির বিরোধিতা করে বলেছে, এটি তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। অন্যদিকে, কেন্দ্রের দাবি, তিন ভাষা সূত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানো হবে এবং এটি কোনো ভাষার বিরুদ্ধে নয়।
ডিএমকে-র নেতারা শাহের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছেন। তারা বলছেন, তামিলনাড়ুর জনগণ তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের অঙ্গীকারের জন্য ডিএমকে-কে সমর্থন করে। অন্যদিকে, বিজেপির মিত্ররা শাহের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করার প্রমাণ। এই বিতর্ক তামিলনাড়ুতে ভাষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। শাহের ঘোষণা এবং তামিলে পড়াশোনার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা আগামী দিনে দেখার বিষয়। তবে, এই ঘটনা তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করেছে।