মন্দিরে ভজনের বিরুদ্ধে ফতোয়া মুসলিম লিগের

muslim-league-fatwa-against-temple-bhajan-kerala-row

কেরলের (Kerala) মালাপ্পুরম জেলার এডাভান্নায় স্থানীয় শরীর নির্বাচন-পরবর্তী উদযাপন ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক ক্রমেই রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিজয় মিছিল চলাকালীন মন্দিরে ভজন ও সুপ্রভাতম বাজানোর বিরুদ্ধে স্লোগান তোলা হয় এবং কার্যত ‘ফতোয়া’র মতো নির্দেশ দিয়ে ওই ধর্মীয় আচার বন্ধের দাবি জানানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম লিগের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

মালয়ালম একটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) এক নেতা অভিযোগ করছেন যে, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ সমর্থিত ইউডিএফ কর্মীরা বিজয় উদযাপনের নামে হিন্দু ধর্মাচরণকে লক্ষ্য করে ভয় দেখানোর রাজনীতি করছে। তাঁর বক্তব্য, মন্দিরে বহু বছর ধরে চলে আসা ভজন ও সুপ্রভাতম হঠাৎ করেই “অসহনীয় শব্দ” বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, অথচ অন্য ধর্মীয় শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে একই কঠোরতা দেখা যায় না।

   

এডাভান্না পড়ে মালাপ্পুরম জেলায়, যা প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই জেলায় ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিনের। ডিসেম্বর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত কেরল স্থানীয় শরীর নির্বাচনে ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) বিপুল জয় পাওয়ার পরই বিভিন্ন পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় বিজয় মিছিল শুরু হয়। সেই উদযাপন থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েকটি এলাকায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা করে মন্দিরে ভোরবেলা সুপ্রভাতম বা সন্ধ্যায় ভজন না বাজানোর “নির্দেশ” দেওয়া হয়। যদিও মুসলিম লিগ নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাঁদের বক্তব্য, এটি কোনও ধর্মীয় ফতোয়া নয়, বরং শব্দদূষণ সংক্রান্ত সাধারণ আপত্তি। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, ভাষা ও সুর এতটাই কঠোর ছিল যে তা ধর্মীয় হুমকির মতোই শোনায়।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি মুসলিম লিগ ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে “সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি”র অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, কেরলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হচ্ছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউডিএফ শিবির বলছে, নির্বাচনে পরাজিত শক্তিগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে চাইছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে শব্দদূষণ সংক্রান্ত আইন ও তার প্রয়োগ। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, ধর্মীয় স্থান থেকে মাইক বা লাউডস্পিকারে শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল ও রাতে আরও কম সীমা মানতে হবে। আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে যে, কোনও ধর্মীয় কার্যকলাপই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে বাস্তবে দেখা যায়, এই নিয়ম প্রয়োগে প্রায়ই দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে আজান নিয়ে কড়া পদক্ষেপ না হলেও, মন্দিরের ভজন বা কীর্তনে প্রশাসনিক আপত্তি দেখা যায়—এমন অভিযোগ নতুন নয়।

মালাপ্পুরমের ঘটনা সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে উসকে দিল। ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম শব্দনিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমাজকর্মীদের একাংশের মতে, আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস আরও বাড়বে।

রাজ্য সরকারের তরফে আপাতত শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, কোনও পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে রাজনৈতিক উত্তাপ যে এত সহজে কমবে না, তা বলাই বাহুল্য। মালাপ্পুরমের এই ঘটনা কেবল একটি জেলার বিষয় নয়, বরং ধর্মীয় সহাবস্থান ও সমান অধিকারের প্রশ্নে গোটা দেশের সামনে নতুন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন