
কানাডা ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করার মধ্যেই ফের বিতর্কের ঝড় তুলল (Lawrence Bishnoi)এক গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট। কানাডার জাতীয় পুলিশ সংস্থা রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (RCMP)-এর একটি গোপন মূল্যায়ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কুখ্যাত লরেন্স বিশনোই গ্যাং নাকি কানাডায় ভারতের সরকারের হয়ে কাজ করছে। ভ্যাঙ্কুভার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউজ এই রিপোর্টটি হাতে পাওয়ার পরই তা প্রকাশ্যে আসে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
RCMP-এর এই তিন পাতার, তারিখবিহীন রিপোর্টে অন্তত ছয়বার উল্লেখ করা হয়েছে যে লরেন্স বিশনোই গ্যাংয়ের সঙ্গে ভারতের সরকারের যোগসূত্র রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানাডায় ‘জঙ্গি সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরেও এই অপরাধচক্র ক্রমশ নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে। পুলিশের মতে, বিশনোই গ্যাং বর্তমানে কানাডা-সহ একাধিক দেশে সক্রিয় এবং তাদের কার্যকলাপ দিন দিন আরও হিংসাত্মক হয়ে উঠছে।
সিঙ্গাপুর পুলিশের বিস্ফোরক তথ্যে জুবিন মৃত্যুতে নয়া মোড়
রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশনোই ক্রাইম গ্রুপ মূলত সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত যার মধ্যে রয়েছে তোলাবাজি, মাদক পাচার, অর্থপাচার এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে RCMP স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই গোষ্ঠীর মূল চালিকাশক্তি কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আদর্শ নয়, বরং নিছক লোভ ও অপরাধমূলক মুনাফা। তবুও রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এই অপরাধচক্র নাকি ভারতের সরকারের স্বার্থে কাজ করছে যা নিয়ে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এই রিপোর্ট প্রকাশের সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গ্লোবাল নিউজ জানিয়েছে, যেদিন RCMP এই মূল্যায়ন প্রকাশ করে, সেদিনই ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি ভারত সফরে রওনা হন। ১২ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর এই বাণিজ্যিক সফরের লক্ষ্য ছিল ভারত-কানাডা অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। ফলে প্রশ্ন উঠছে এই সংবেদনশীল সময়ে এমন রিপোর্ট প্রকাশের নেপথ্যে আদৌ কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।
উল্লেখ্য, জাস্টিন ট্রুডোর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে ভারত ও কানাডার সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। কানাডা অভিযোগ করেছিল, খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ডে ভারতের হাত রয়েছে। ভারত বারবার এই অভিযোগ খারিজ করে প্রমাণ দাবি করলেও, অটোয়া কোনও দৃঢ় প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। পরে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কিছুটা কমে এবং ২০২৫ সালের আগস্টে উভয় দেশই একে অপরের দেশে নতুন দূত নিয়োগ করে।
RCMP-এর রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, লরেন্স বিশনোই বর্তমানে ভারতের আহমেদাবাদের সবরমতী জেলে বন্দি থাকলেও সেখান থেকেই সে তার আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা করছে। কানাডায় গত এক বছরে এই গ্যাংয়ের হিংসাত্মক কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি পুলিশের। এমনকি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারে শহরে কৌতুকশিল্পী কপিল শর্মার ‘ক্যাপস ক্যাফে’-তে তোলাবাজির উদ্দেশ্যে হামলার সঙ্গেও বিশনোই গ্যাংয়ের নাম জড়িয়েছে।
তবে কানাডার এই অভিযোগের পাল্টা যুক্তিও সামনে এসেছে। ভারতের কূটনীতিকরা বহুবার দাবি করেছেন, কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই ভারতবিরোধী জঙ্গি ও অপরাধীদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে। কানাডায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ পত্নায়েক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “অভিযোগ তোলা সহজ। ভারত গত ৪০ বছর ধরে কানাডায় সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। কিন্তু সেখানে আজ পর্যন্ত একজনেরও সাজা হয়নি।”
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে যদি বিশনোই গ্যাং সত্যিই কানাডায় এত বছর ধরে সক্রিয় থাকে, তবে কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন আগে কড়া পদক্ষেপ নেয়নি? অপরাধচক্রের বিস্তারের দায় কি শুধুই বাইরের শক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়, নাকি কানাডার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতাও এর জন্য দায়ী?ভারত-কানাডা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মাঝেই এই রিপোর্ট নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।










