ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত কেরল (Kerala)দীর্ঘদিন ধরে তার সামাজিক ব্যবহার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত। বামপন্থী শাসনের অধীনে এই রাজ্যটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সমতা এবং জনকল্যাণে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে, যা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এটিকে আলাদা করে তুলেছে। কেরলের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে বামপন্থী দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভিত্তি। এই রাজ্যের সামাজিক ব্যবহারের ধরন এখন বিশ্বব্যাপী গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইন্ডিয়া টুডের সমীক্ষায় এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ।
শিক্ষা ও সাক্ষরতায় অগ্রগামী
কেরল ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে সাক্ষরতার হার ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৯৫০-এর দশক থেকে বামপন্থী সরকারগুলো শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছে। ১৯৫৭ সালে কেরল বিশ্বের দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে একটি কমিউনিস্ট সরকার নির্বাচিত করে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজের গোড়া থেকে পরিবর্তনের সূচনা করে। কেরল স্টেট লিটারেসি মিশন অথরিটি (কেএসএলএমএ) এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক সম্প্রদায়, যেমন ট্রান্সজেন্ডারদের জন্যও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এই উদ্যোগগুলো সমাজে সচেতনতা ও সমতার ভিত্তি তৈরি করেছে, যা কেরলের সামাজিক ব্যবহারকে শক্তিশালী করেছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব
কেরলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভারতের অন্যতম সেরা। নিম্ন শিশু মৃত্যুহার, উচ্চ আয়ুষ্কাল এবং স্বাস্থ্যসেবায় সহজ প্রবেশাধিকার এই রাজ্যের বৈশিষ্ট্য। বামপন্থী সরকারগুলো সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সাল থেকে প্রায় ৬০০ ডাক্তার এবং ১৫০০ নার্স নিয়োগ করা হয়েছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় কেরলের দ্রুত লকডাউন, বিনামূল্যে সরবরাহ বিতরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইনের মতো পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। এই সামাজিক দায়বদ্ধতা কেরলের জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় চেতনা গড়ে তুলেছে।
সমাজ সংস্কারের ঐতিহ্য
কেরলের সামাজিক ব্যবহারের শিকড় রয়েছে ১৯শ শতাব্দীর সমাজ সংস্কার আন্দোলনে। থাইকড আইয়া, শ্রী নারায়ণ গুরু, আয়্যঙ্কালি এবং চাটাম্বি স্বামীগলের মতো সংস্কারকরা জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এই আন্দোলনগুলো কেরলের সমাজে গভীর পরিবর্তন এনেছে, যা পরবর্তীতে বামপন্থী দলগুলোর হাতে আরও শক্তিশালী হয়েছে। কেরলের বামপন্থী আন্দোলন জমি সংস্কার, শ্রমিক অধিকার এবং শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে নিম্নবর্গের সামাজিক মর্যাদা উন্নীত করেছে। এই ঐতিহাসিক ভিত্তি কেরলের সামাজিক ব্যবহারকে একটি সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।
জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা
কেরলের সামাজিক ব্যবহারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এখানে জনগণ সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার জন্য প্রায়ই প্রতিবাদ করে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা ও ভাইরাল প্রাদুর্ভাবের সময় জনগণের স্বেচ্ছাসেবী সহযোগিতা। কেরলের সাফল্যের অন্যতম কারণ হল এর শক্তিশালী সামাজিক ব্যবস্থা, যা উচ্চ সাক্ষরতা এবং নিম্ন দারিদ্র্যের হারের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থা কেরলকে সংকট মোকাবিলায় সক্ষম করেছে, যেমন ২০১৮ সালের নিপাহ ভাইরাস এবং ২০২০ সালের করোনা মহামারী।
বাম শাসনের ভূমিকা
কেরলের বামপন্থী সরকার, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) বা সিপিএম, সমাজে গণতান্ত্রিকীকরণ ও কল্যাণমূলক নীতির উপর জোর দিয়েছে। ১৯৮০ সালে গঠিত লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) কেরলের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। এই জোট স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণে বিনিয়োগ করে কেরলকে একটি উন্নত সামাজিক মডেলে রূপান্তরিত করেছে।
কেরলের সামাজিক ব্যবহার শুধুমাত্র পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জীবন্ত সংস্কৃতি যা সমতা, সচেতনতা এবং সম্প্রদায়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বাম শাসনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং সমাজ সংস্কারের ঐতিহ্য কেরলকে ভারতের অন্যতম প্রগতিশীল রাজ্যে পরিণত করেছে। এই মডেল বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ।