HomeBharatবন্ধ্যাত্ব দূর করার নামে ধর্ষণ! কেরলে গ্রেফতার ভুয়ো ‘ধর্মগুরু’

বন্ধ্যাত্ব দূর করার নামে ধর্ষণ! কেরলে গ্রেফতার ভুয়ো ‘ধর্মগুরু’

- Advertisement -

অনলাইন ভবিষ্যদ্বক্তার চালবাজিতে শিকার মহিলা, তদন্তে উঠে আসছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। কেরল (Kerala) আবারও কাঁপল ভুয়ো ধর্মীয় গুরুর কাণ্ডে। মালাপ্পুরম জেলার এক মহিলাকে ‘ঈশ্বরীয় আচার’ দেখানোর নাম করে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৬ বছর বয়সি সাজিল নামের এক ব্যক্তিকে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইউটিউবের মাধ্যমে নিজেকে আত্মপ্রচার করা এবং ‘‘আধ্যাত্মিক চিকিৎসক’’ পরিচয় দেওয়াই ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র। ভিডিওতে কখনও সবুজ পাগড়ি, কখনও সুফি-পোশাক পরে তিনি দাবি করতেন— ঈশ্বরীয় শক্তির মাধ্যমে বন্ধ্যাত্ব দূর করতে পারেন, এমনকি দিব্য গর্ভধারণও করিয়ে দিতে পারেন।

ইউটিউবে ‘মাহদি ইমাম’ সেজে প্রতারণা

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সাজিল ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিও আপলোড করতেন, যেখানে তিনি নিজেকে ‘মাহদি ইমাম’— অর্থাৎ ইসলামিক ভবিষ্যদ্বক্তা— বলে দাবি করতেন। এই পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি ভক্ত সংগ্রহ করে ফেলেন। মালাপ্পুরম, কোঝিকোড ও পাশের জেলাগুলির বহু মানুষ তাঁর লাইভ সেশন দেখতেন। এমনকি আধ্যাত্মিক সমস্যার সমাধান, সন্তানের আশীর্বাদ, কালাজাদু মুক্তি— এ ধরনের শিরোনামে তিনি অনলাইন পরামর্শদানের ব্যবস্থাও করেছিলেন। এখান থেকেই শুরু তাঁর মূল প্রতারণা।

   

পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘সাজিল দাবি করত যে, বিশেষ আচার অনুষ্ঠান করলে তিনি ‘দিব্য শক্তির’ সাহায্যে বন্ধ্যাত্ব দূর করতে পারেন। বেশ কয়েকজন দম্পতির সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখতেন। অভিযোগকারী মহিলার ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে সে।’’

‘দিব্য আচার’-এর নামে একাকী ডেকে নেন মহিলা– তারপর…

অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী মহিলা দীর্ঘদিন ধরে মা হতে পারছিলেন না। পরিবারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা করেও ফল না মেলায় অবশেষে অনলাইনে সাজিলের ভিডিও দেখে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাজিল তাঁকে বোঝায়— চিকিৎসার দরকার নেই, বিশেষ আধ্যাত্মিক আচারেই নাকি সব সমস্যা দূর হবে। তবে এই আচার গোপনে এবং একান্ত সাক্ষাতে করতে হবে।

নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে মালাপ্পুরমের একটি ভাড়া বাড়িতে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। পুলিশের নথি বলছে, সেখানেই ‘আধ্যাত্মিক ক্রিয়া’ দেখানোর নাম করে সাজিল মহিলাকে ধর্ষণ করেন। মানসিক চাপে একটু হলেও বিশ্বাস জমে ওঠায় মহিলা প্রথমে প্রতিবাদ করতে পারেননি। তবে ঘটনার পরে অপরাধবোধ ও আতঙ্কে তিনি পরিবারের কাছে সব জানান। পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতায় তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।

গ্রেফতারের পর মিলছে আরও অভিযোগ

অভিযোগের ভিত্তিতে মালাপ্পুরম জেলা পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করে সাজিলকে গ্রেফতার করা হয়। থানায় নিয়ে গিয়ে জেরা করার পর আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। সূত্রের দাবি, সাজিল আগেও বহু মহিলার সঙ্গে ‘গুপ্ত আচার’-এর নামে যোগাযোগ করেছিল। কিছু মহিলা ইতিমধ্যেই পুলিশকে জানিয়েছেন যে সাজিল তাঁদেরও অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিল— যদিও তাঁরা ফাঁদে পড়েননি।

পুলিশ সন্দেহ করছে, এটি হয়তো একক ঘটনা নয়, বরং বড়সড় প্রতারণার নেটওয়ার্ক। তদন্তকারীরা এখন সাজিলের ইউটিউব চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখছেন। কতজন ভুক্তভোগী তাঁর খপ্পরে পড়েছেন, সেটিও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন

এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ‘অ্যাংরি স্যাফরন’-সহ বহু অ্যাকাউন্ট থেকে অভিযুক্তের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে টিপ্পনী কাটছেন— ‘‘ডিজিটাল যুগের নতুন প্রতারকগুরু’’। তবে সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দ্রুত ভাইরাল হওয়া এই তথ্যগুলোর যথাযথ যাচাই জরুরি এবং অভিযোগ প্রমাণিত না-হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন বিচার না করে বসেন।

রাজ্যজুড়ে আস্থা সংকট, সতর্কতা জারি পুলিশের

কেরলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘প্যারানরমাল চিকিৎসক’, ‘আধ্যাত্মিক গুরু’ বা ‘জিন্ন তাড়ানোর ওস্তাদ’ পরিচয়ে প্রতারণা বেড়েছে বলে পুলিশ আগেই সতর্ক করেছিল। এবার ফের সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। রাজ্য পুলিশ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছে—

  • ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার দাবি করলে তা বিশ্বাস করবেন না।
  • ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান দেখানোর নামে কেউ একা ডাকলে পুলিশে জানান।
  • কোনও ‘চিকিৎসা’-ই যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এড়িয়ে গোপনীয়তার অজুহাত দেয়, তবে তা প্রতারণা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ভুক্তভোগীর পরিবার কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। সাজিলকে আদালতে পেশ করা হয়েছে এবং পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে। তদন্ত এগোচ্ছে, আর ততই উঠে আসছে অন্ধবিশ্বাস ও ডিজিটাল প্রতারণার মর্মান্তিক বাস্তবতা— যেখানে ‘মা হওয়ার স্বপ্ন’ দেখানো হয়, আর সুযোগ নিয়ে নিংড়ে নেওয়া হয় এক অসহায় মহিলার বিশ্বাস।

- Advertisement -
এই সংক্রান্ত আরও খবর
- Advertisment -

Most Popular