কন্নড় অভিনেত্রী রানিয়া রাও-এর (Ranya Rao) সঙ্গে যুক্ত সোনা চোরাচালান মামলায় আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোনার ব্যবসায়ী সাহিল জৈনকে ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই) গ্রেফতার করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি চোরাই সোনা বিক্রি ও নিষ্পত্তিতে সহায়তা করেছেন। গ্রেফতারের পর সাহিল জৈনকে চার দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে, যাতে তদন্তে আরও তথ্য সংগ্রহ করা যায়। এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত রানিয়া রাও গত ৩ মার্চ গ্রেফতার হয়েছিলেন, যখন তিনি বেঙ্গালুরুর কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৪.২ কেজি সোনা নিয়ে ধরা পড়েন, যার মূল্য ১২.৫৬ কোটি টাকারও বেশি।
এই মামলায় সাহিল জৈন তৃতীয় গ্রেফতার ব্যক্তি। ডিআরআই-এর তদন্তে জানা গেছে, তিনি রানিয়া রাও-এর চোরাই সোনা বিক্রির কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। বুধবার সকালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে বিশেষ অর্থনৈতিক অপরাধ আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁকে চার দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, সাহিল জৈন এই চোরাচালান নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন এবং তাঁর জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য প্রকাশ পেতে পারে।
Ranya Rao-এর জামিনের শুনানি আজ
এদিকে, এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত রানিয়া রাও-এর জামিনের আবেদনের রায় আজ, বৃহস্পতিবার, সেশন কোর্টে ঘোষণা হওয়ার কথা। প্রসিকিউশন আদালতে যুক্তি দিয়েছে যে, রানিয়া হাওয়ালা চ্যানেলের মাধ্যমে সোনা কেনার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দুবাই থেকে সোনা এনে ভারতে চোরাচালান করেছেন এবং এই কাজে তিনি একটি বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। রানিয়া বর্তমানে পারাপ্পানা আগ্রাহারা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর জামিনের আবেদন নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত এই মামলার ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তরুণ রাজের জামিনের রায়ও আজ
রানিয়া রাও-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং এই মামলার দ্বিতীয় অভিযুক্ত তরুণ রাজের জামিনের আবেদনের রায়ও আজ ঘোষিত হবে। তরুণ রাজ, যিনি বেঙ্গালুরুর একজন প্রখ্যাত হোটেল ব্যবসায়ীর নাতি, এই চোরাচালানে রানিয়ার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিআরআই-এর দাবি, তিনি রানিয়ার সঙ্গে দুবাই-ভিত্তিক একটি কোম্পানি ‘ভিরা ডায়মন্ডস’ পরিচালনা করতেন, যেটি সোনা আমদানির নামে ভারতে চোরাচালান করত। তরুণ গত ১১ মার্চ গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং তাঁর জামিনের আবেদনও আদালত খারিজ করেছিল।
রামচন্দ্র রাও-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই মামলায় রানিয়া রাও-এর সৎবাবা, কর্ণাটক পুলিশের ডিজিপি পদমর্যাদার অফিসার রামচন্দ্র রাও-এর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। রানিয়ার গ্রেফতারির কয়েক দিন পর রামচন্দ্রকে ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ পাঠানো হয়েছে। সরকারি আদেশে এর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে, তদন্তে জানা গেছে, রানিয়া তাঁর সৎবাবার পদ-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে বিমানবন্দরে ভিআইপি প্রস্থান সুবিধা পেয়েছিলেন, যার ফলে তিনি কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা এড়াতে পেরেছিলেন। রামচন্দ্র রাও অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি রানিয়ার কার্যকলাপ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না এবং তাঁর সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
রানিয়ার ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ
ডিআরআই-এর তদন্তে রানিয়া রাও-এর ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে সন্দেহ জাগে। গত ছয় মাসে তিনি ২৭ বার দুবাই গিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রেও ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর এই ভ্রমণের ধরণ তদন্তকারীদের নজরে আসে এবং সন্দেহ হয় যে তিনি একটি বড় চোরাচালান নেটওয়ার্কের অংশ। ৩ মার্চ তাঁকে গ্রেফতারের পর, তাঁর বেঙ্গালুরুর ল্যাভেল রোডের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ২.০৬ কোটি টাকার সোনার গয়না এবং ২.৬৭ কোটি টাকার ভারতীয় মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। ডিআরআই জানিয়েছে, এই সম্পত্তির উৎস সম্পর্কে রানিয়া কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
তদন্তে নতুন মোড়
সাহিল জৈনের গ্রেফতারি এই মামলায় নতুন মোড় এনেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, তিনি চোরাই সোনা বিক্রির একটি গুরুত্বপূর্ণ চেনের অংশ ছিলেন। বেল্লারির এই সোনার ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের আরও সদস্যদের চিহ্নিত করা যেতে পারে। ডিআরআই-এর দাবি, সাহিল জৈন রানিয়া রাও-এর সঙ্গে একাধিকবার সোনা বিক্রির কাজে জড়িত ছিলেন এবং বিক্রির টাকা ভাগ করে নিতেন, যা কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬২-এর অধীনে অপরাধ।
এছাড়া, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) এই মামলার তদন্তে যোগ দিয়েছে। ইডি সন্দেহ করছে, এই চোরাচালানের পিছনে হাওয়ালা লেনদেনের মাধ্যমে টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। সিবিআই একটি এফআইআর দায়ের করেছে, যেখানে ‘অজ্ঞাত সরকারি কর্মচারী’ এবং ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’দের অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা রামচন্দ্র রাও-এর ভূমিকা নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলেছে।
রানিয়ার দাবি ও বিতর্ক
রানিয়া রাও দাবি করেছেন, তিনি এই চোরাচালানে জড়ানোর জন্য বাধ্য হয়েছিলেন এবং তিনি কেবল একজন ‘মিউল’ বা বাহক ছিলেন। তিনি বলেছেন, অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাঁকে ফোনে নির্দেশ দিয়েছিল এবং দুবাই বিমানবন্দরে সোনা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে, তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া দুবাই কাস্টমসের নথি (১৩ নভেম্বর ও ২০ ডিসেম্বর, ২০২৪) দেখায়, তিনি আগেও সোনা কিনেছিলেন এবং জেনেভার উদ্দেশে ঘোষণা করলেও ভারতে এনেছিলেন। এই তথ্য তাঁর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রানিয়া রাও সোনা চোরাচালান মামলা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সাহিল জৈনের গ্রেফতারি এবং আজকের জামিনের রায় এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তদন্তকারীরা এই নেটওয়ার্কের মূল হোতাকে খুঁজে বের করতে মরিয়া, এবং রামচন্দ্র রাও-এর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা তুঙ্গে। এই ঘটনা ভারতের বিমানবন্দর নিরাপত্তা এবং চোরাচালান বিরোধী ব্যবস্থার দুর্বলতাও তুলে ধরেছে।