
বৃহস্পতিবার সংসদের নিম্নকক্ষে প্রবল হট্টগোলের মধ্যেই পাস হয়ে গেল ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা ‘গ্রাম জি’ (G RAM G) বিল, ২০২৫। বিলটি পাশ হতেই বিরোধী শিবিরে প্রবল প্রতিবাদ শুরু হয়। কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, এই বিলের মাধ্যমে কার্যত মহাত্মা গান্ধীর নাম মুছে দেওয়া হচ্ছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইনের শরীর থেকে, যা ‘জাতির জনক’-কে অপমান করার শামিল। পাশাপাশি, তাঁদের দাবি—এই আইন এমজিএনরেগা-র মূল দর্শন ও অধিকারভিত্তিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
দিনভর সংসদে উত্তাপের কেন্দ্রে ছিল ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের নাম বদল। এতদিন যে প্রকল্প দেশজুড়ে পরিচিত ছিল মহাত্মা গান্ধীর নামে—মনরেগা—নতুন আইনে সেখানে আর জাতির জনকের নাম নেই। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই শাসক-বিরোধী সংঘাত চরমে পৌঁছয়।
এই বিতর্কের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় বাংলাতেও। বৃহস্পতিবার কলকাতার ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে শিল্প ও বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চ থেকে কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মন্তব্য,
“মনরেগা থেকে গান্ধীর নাম বাদ দেওয়া হল! সত্যিই লজ্জা হয়। আমরা কি জাতির জনককে ভুলে যাচ্ছি?”

একই মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রাজ্যের ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্পের নাম বদলে তা মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করা হবে। বিজেপিকে নিশানা করে তাঁর কটাক্ষ, “আপনারা যদি গান্ধীকে সম্মান না দেন, আমরা দেব। সম্মান দিতে আমরা জানি।”
কেন্দ্রের নতুন বিলে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য বছরে ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিনের কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে পাশাপাশি বলা হয়েছে, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ বহন করতে হবে রাজ্যগুলিকেই। এই আর্থিক দায় চাপানোর বিষয়টি নিয়েও আপত্তিতে ফেটে পড়ে বিরোধীরা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সংসদ চত্বরে প্রতিবাদে নামেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সাংসদরা। গান্ধীর ছবি হাতে নিয়ে লোকসভার ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখানো হয়, ছেঁড়া হয় বিলের কপি। প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতায় সংসদে বক্তব্য রাখেন কংগ্রেসের প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, ডিএমকে-র টি আর বালু এবং সমাজবাদী পার্টির ধর্মেন্দ্র যাদব। তাঁদের দাবি ছিল, এত গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হোক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই ধ্বনিভোটে বিল পাশ করানো হয়।
এদিন সংসদের ভিতরে প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে সরাসরি বাক্যযুদ্ধে জড়ান কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান। প্রিয়ঙ্কার কটাক্ষ ছিল, “এই সরকারের সব কিছুরই নাম বদলানোর নেশা আছে।” জবাবে শিবরাজ দাবি করেন, কংগ্রেসই একসময় নানা প্রকল্পের নাম জওহরলাল নেহরুর নামে রেখেছিল। পাশাপাশি তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকার ১০০ দিনের কাজ চালু করলেও ২০০৯ সালের ভোটের কথা ভেবেই পরে গান্ধীর নাম জোড়া হয়েছিল।
বিরোধীদের অভিযোগ, প্রকল্পের নাম থেকে গান্ধীর নাম মুছে ফেলা মানে জাতির জনকের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা। তবে সেই অভিযোগ খারিজ করে কেন্দ্রের পাল্টা সাফাই—মোদী সরকার নাম নয়, কাজে গান্ধীর আদর্শ অনুসরণ করে।
এই বিল বৃহস্পতিবারই রাজ্যসভায় পেশ হতে পারে বলে সূত্রের খবর। শুক্রবার শীতকালীন অধিবেশনের শেষ দিন। বিরোধীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি উচ্চকক্ষেও বিলটি পাশ করানোর চেষ্টা হবে। ফলে সংসদের বাইরেও এই বিল ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।










