
নয়াদিল্লি: দেশজুড়ে বেআইনি মাদকচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আরও একবার (ED raids codeine cough syrup racket)স্পষ্ট করে দিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। কোডিন-ভিত্তিক কফ সিরাপ (CBCS) উৎপাদন ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত বহুমূল্যের র্যাকেটের বিরুদ্ধে শুক্রবার তিন রাজ্যে একযোগে বড়সড় অভিযান চালাল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং গুজরাট মিলিয়ে মোট ২৫টি আলাদা স্থানে তল্লাশি চালিয়ে বহু নথি, ডিজিটাল ডিভাইস ও আর্থিক লেনদেনের ডেটা সংগ্রহ করেছে ইডি। মনি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের (PMLA) অধীনে এই তদন্ত চলায় র্যাকেটের আর্থিক জালের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
‘চুরিও প্রকাশ্যে করেন, সিগারেটও…!’ সৌগতর ধূমপানে কটাক্ষ গিরিরাজের
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, উত্তরপ্রদেশের লখনউ, বারাণসি, জৌনপুর ও সাহারনপুর ছাড়াও রাঁচি ও আহমেদাবাদেও তল্লাশি শুরু হয় ভোর থেকেই। ইডির বিভিন্ন দল আলাদা আলাদা স্থানে পৌঁছে সন্দেহভাজন ব্যবসায়ী, ফার্মা ইউনিট ও মধ্যস্থতাকারীদের বাড়ি–অফিসে নথিপত্র খতিয়ে দেখে। এই র্যাকেটটির মূল অভিযোগ— কোডিন-ভিত্তিক কফ সিরাপের অবৈধ উৎপাদন, জাল কেমিক্যাল লাইসেন্স ব্যবহার, অবৈধ পরিবহন এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারত-বাংলাদেশ রুটে তস্করি।
উত্তরপ্রদেশ সরকার এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ সামনে আসার পর ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পুলিশের ৩০টিরও বেশি এফআইআর এই র্যাকেটের বিস্তৃতি বুঝিয়ে দেয়। তদন্তে উঠে এসেছে— বিপুল পরিমাণ কফ সিরাপ অনুমোদিত পরিমাণের বহু গুণ বেশি কোডিন মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছিল, যা সাধারণ ওষুধের মোড়কে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছিল। শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরেই নয়, দেশে ও দেশের বাইরে এর অবৈধ কারবার চলছিল দীর্ঘদিন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হল, এই কেলেঙ্কারির মূল হোতা বলে পরিচিত শুভম জয়সওয়াল দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তদন্তে জানা যায়, তিনি ভারতে গ্রেফতারের মুখে পড়তে পারেন বুঝেই দুবাইয়ে পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর বাবা ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ-র হাতে ধরা পড়েছেন এবং র্যাকেটের আর্থিক নথিপত্র উদ্ধার করতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। শুভমের সহযোগী আলোক সিংহ, অমিত সিংহ সহ আরও কয়েক জন ব্যবসায়ীর বাড়িতেও ইডি তল্লাশি চালাচ্ছে।
ইডির অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছেন এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, বিষ্ণু আগরওয়াল। তাঁকে সন্দেহ করা হচ্ছে এই র্যাকেটের বিশাল অঙ্কের অর্থ গোপন রাখতে ফিনান্সিয়াল লেনদেন পরিচালনা করতেন তিনি। বিভিন্ন কোম্পানির নামে ভুয়ো হিসেব, কালো টাকা সাদা করার লেনদেন এবং হাওলা রুট ব্যবহারের মতো অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ইডি সূত্রের দাবি, এই র্যাকেটের মাধ্যমে অন্তত ১,০০০ কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ ভুয়ো ফার্মা লাইসেন্স, শেল কোম্পানি, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব এবং হাওলা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ঘোরানো হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই মনি লন্ডারিং চক্রে আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত থাকতে পারেন, এমনও আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ইতিমধ্যেই ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করে আলাদা তদন্ত চালাচ্ছে। SIT ও ইডি দুই সংস্থার যৌথ তথ্য আদানপ্রদানের ফলে তদন্ত আরও দ্রুত এগোচ্ছে। কফ সিরাপের আড়ালে চলা এই অবৈধ মাদক ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত ছিল এবং রাজ্য সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, তা গোটা ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কেন্দ্রীয় সংস্থার মতে, এই অভিযান শুধু একটি অবৈধ ব্যবসার শিকড় উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা নয়; বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের কফ সিরাপ ও মাদক-চক্রের নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, এবং আগামী দিনে আরও বড় তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা প্রবল।










