
ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ফের স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্ষমতার ভারসাম্য। নির্বাচন কমিশন (ECI)-এর প্রকাশিত ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষের রাজনৈতিক অনুদানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কংগ্রেসের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে বিজেপি। কমিশনের তথ্য বলছে, ওই আর্থিক বছরে বিজেপির তহবিলে এসেছে ৬,০৮৮ কোটি টাকা, যেখানে কংগ্রেসের প্রাপ্ত অনুদানের অঙ্ক ৫২২ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ইলেক্টোরাল বন্ড প্রকল্প বাতিল করার পর এটিই প্রথম পূর্ণ আর্থিক বছর, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলির অর্থপ্রাপ্তির হিসাব প্রকাশ্যে এল। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৩–২৪ অর্থবর্ষে বিজেপি যেখানে পেয়েছিল ৩,৯৬৭ কোটি টাকা, সেখানে কংগ্রেসের প্রাপ্তি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি—১,১৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কংগ্রেসের অনুদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, বিপরীতে বিজেপির তহবিল বেড়েছে বহুগুণ।
নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, মোট ১৯টি নথিভুক্ত ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের মধ্যে ১৩টি ট্রাস্ট ইতিমধ্যেই ২০২৪–২৫ সালের অবদান সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। নির্বাচন সংক্রান্ত নিয়ম অনুসারে, একটি ইলেক্টোরাল ট্রাস্টকে তার প্রাপ্ত মোট তহবিলের অন্তত ৯৫ শতাংশ একই আর্থিক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বণ্টন করতে হয়।
ইসিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ সালে ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের মাধ্যমে যে মোট রাজনৈতিক অনুদান এসেছে, তার প্রায় ৮৫ শতাংশই পেয়েছে বিজেপি। তুলনায়, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগের বছরে এই হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ট্রাস্টভিত্তিক অর্থপ্রবাহেও বিজেপির আধিপত্য আরও বেড়েছে।
এই সমস্ত তথ্যের আওতায় এসেছে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কালে প্রাপ্ত অনুদান। উল্লেখ্য, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুনের মধ্যে—অর্থাৎ নির্বাচনী সময়পর্বের বড় অংশই এই আর্থিক বছরের মধ্যে পড়েছে।
ইলেক্টোরাল বন্ড বাতিল হওয়ার আগে রাজনৈতিক অনুদানের বড় অংশ আসত ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, ২০২৪–২৫ সালে রিপোর্ট হওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক অনুদান এসেছে ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের মাধ্যমে, যা রাজনৈতিক অর্থায়নের কাঠামোয় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনুদানদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট। এই ট্রাস্ট একাই বিজেপিকে ২,১৮১ কোটি টাকা এবং কংগ্রেসকে ২১৬ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। কর্পোরেট দাতাদের মধ্যে প্রুডেন্ট ট্রাস্টে সর্বোচ্চ অনুদান এসেছে Elevated Avenue Realty LLP থেকে—যে সংস্থাটি ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র সঙ্গে যুক্ত। সংস্থাটি ৫০০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রোগ্রেসিভ ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট, যা বিজেপিকে ৭৫৭.৬ কোটি টাকা এবং কংগ্রেসকে ৭৭.৩ কোটি টাকা দিয়েছে। তৃতীয় বৃহত্তম দাতা এবি জেনারেল ট্রাস্ট, যারা বিজেপিকে ৬০৬ কোটি এবং কংগ্রেসকে মাত্র ১৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।
ভারতের আইন অনুযায়ী, সব নথিভুক্ত রাজনৈতিক দলকে প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনের কাছে অডিট রিপোর্ট ও অনুদান সংক্রান্ত বিস্তারিত হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই বিধান জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ এবং আয়কর আইন, ১৯৬১-এর আওতায় রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত।
এ ছাড়া আয়কর আইনের ৮০জিজিবি (Section 80GGB) ধারায় সংস্থা ও ব্যক্তিগত দাতারা অনুমোদিত রাজনৈতিক অনুদানের উপর ১০০ শতাংশ করছাড় পেয়ে থাকেন, যা রাজনৈতিক অনুদানকে আর্থিকভাবে আরও উৎসাহিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইলেক্টোরাল বন্ড-পরবর্তী ভারতে রাজনৈতিক অনুদানের নতুন চেহারা এবং তাতে বিজেপির একচেটিয়া প্রভাব আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।










